জুলাই আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়েছে। বিপ্লবের চাপে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রী-এমপিদের একটি বড় অংশ ভারতে এবং বাকিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষমতা হারিয়ে তারা এখন দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বরূপ হয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন তারা। অনেকেই নিজ নামের আইডি পরিবর্তন করে বা ছদ্মনামে নতুন আইডি খুলে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। কেউ কেউ পুরোনো আইডির সব তথ্য মুছে ফেলে সাধারণ পোস্ট দিলেও একাধিক ছদ্মনামি আইডির মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছেন। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন অ্যাপ ও অনলাইন মাধ্যমে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং পলাতক আওয়ামী লীগের হাই কমান্ডের সঙ্গেও দেশ-বিদেশে সমন্বয় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, নাটোরে একটি চক্র সক্রিয়ভাবে এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে নাটোর-২ আসনে তাদের তৎপরতা বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা প্রতিদিন নতুন নতুন পোস্ট দিয়ে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করছেন। হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, তারা ফ্যাসিবাদের পক্ষে এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে। বিএনপির সঙ্গেও কৌশলে মিশে তারা বেশ সোচ্চার হয়ে উঠেছে। নিয়মিত অর্থ সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি পরিচয় গোপন রেখে প্রশাসনের সঙ্গে সাক্ষাতের অভিযোগও উঠেছে। এ প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
নলডাঙ্গাসহ নাটোর সদরে সক্রিয় আওয়ামী লীগের এজেন্টরা কথিত মানবাধিকার সংগঠন ও নামধারী বিভিন্ন সংস্থার আড়ালে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে পরিচয় গোপন রেখে পুলিশ প্রশাসন ও নলডাঙ্গার ফ্যাসিবাদের কেন্দ্রীয় নেতা, নলডাঙ্গা আওয়ামী যুবলীগ নেতা, আওয়ামী লীগ ও মহিলা লীগের কর্মীদের নিয়ে গোপন বৈঠকও সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি ও জামায়াতের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের সদস্য ও বিশেষ এজেন্টদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, হোয়াটসঅ্যাপে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং একটি আওয়ামীপন্থী গোষ্ঠী নির্বাচনে মাঠে ও কেন্দ্র দখলের পরিকল্পনাও করছে। হাইব্রিড কৌশলে তারা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এবং বিএনপির গোপন গ্রুপেও অবস্থান করছে।
বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, দেশব্যাপী আলোচিত নলডাঙ্গার রেল নাশকতা, ককটেল ও পেট্রোল বোমা হামলার চেষ্টা, ইন্টারনেট সেবা বন্ধ, জাল টাকার কারবারসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই চক্র জড়িত। এ ছাড়া মাধনগর বাজার, মাধনগর ডিগ্রি কলেজ, এস আই উচ্চ বিদ্যালয়, বাজারের প্রবেশমুখ, বাজেহালতি ব্রিজ, আনিচ মোড়, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, বাঁশিলা মাদ্রাসা, বাঁশিলা হাইস্কুল এবং পাটুল-নলডাঙ্গা সড়ক এলাকার দেয়ালে দেয়ালে লাল ও কালো রঙে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখা হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নাটোর-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের বাজেহালতি ব্রিজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে লাল ও কালো কালি দিয়ে লেখা এসব স্লোগান এখনও দৃশ্যমান।
সম্প্রতি সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে উপজেলা জুড়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাবেক পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন পাঠান, উপজেলা জাসাস সভাপতি ও সাবেক পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম সান্টু, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক উজ্জল, সাবেক পৌর বিএনপির সভাপতি এম এ হাফিজ, সাবেক উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বুলবুলসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, বিগত দিনে আমরা পাঁচজন লোকও এক জায়গায় হতে পারিনি। অথচ এখন বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখা হচ্ছে। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা মামলা করলে প্রশাসন নেয় না, কিন্তু আওয়ামী লীগ মামলা করলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। এলাকায় সর্বহারা লোকজন ঘোরাফেরা করছে। তাদের গ্রেপ্তার না করা হলে আমরা বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করব।
তারা আরও দাবি করেন, নলডাঙ্গার রেল নাশকতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো নাশকতাকারী গ্রেপ্তার হয়নি। গোপন বৈঠক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে নির্দেশনা দিয়ে নাশকতার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ সংগঠন শহরে বাইক শোডাউন ও মিছিলও করছে বলে অভিযোগ করা হয়। বক্তারা নাশকতাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।
সম্প্রতি এই আসনে প্রশাসনের কয়েকটি অভিযান হলেও রহস্যজনক কারণে নিষিদ্ধ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জান, একটি অসাধু চক্র ও রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মীর গোপন আঁতাত ভবিষ্যতে চরম অস্থিরতা ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
নলডাঙ্গা উপজেলা আনসার-ভিডিপি কর্মকর্তা মো. এরশাদ আলী জানান, নির্বাচন উপলক্ষে ৬৬৩ জন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর মধ্যে ১৫৩ জন থাকবে অস্ত্রধারী। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনজন করে অস্ত্রধারী আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।’
নলডাঙ্গা থানার ওসি মো. নূরে আলম বলেন, ‘কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে।’
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. ফরমাজুল ইসলাম জানান, কেন্দ্রগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আল এমরান খাঁন বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’



