শত বছরের প্রাচীন বেরুলা খালের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ কিলোমিটার। লাকসাম উপজেলার ফতেপুর গ্রাম থেকে শুরু হয়ে নোয়াখালীর চৌমুহনী গিয়ে মিশেছে খালটি। বিগত সরকারের অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও দখলে হারিয়ে গেছে এ খাল। এরই মধ্যে অবশিষ্ট অংশও ভরাট হয়ে গেছে। ভরাট করে খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে দোকান ও ঘরবাড়ি।
কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কে চার লেন নির্মাণকাজের জন্য খালটির অস্তিত্ব একবারেই বিলুপ্ত। সড়ক সম্প্রসারণ করতে গিয়ে খালটির বেশির ভাগ অংশ ভরাট হরা হয়। বাকি অংশের জায়গার মালিক ও কিছু অসাধু চক্র পুরো ভরাট করে দখলে নিয়েছে।
লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার অংশে পুরো খাল ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এতে ওই এলাকার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। সেচ সংকটে পড়েছে কৃষিজমি। নষ্ট হয়ে গেছে প্রাকৃতিক মাছের উৎস। খালটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে যাওয়ায় কুমিল্লা জেলার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট, নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী ও বেগমগঞ্জ উপজেলার তিন সহস্রাধিক একর কৃষিজমির উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হচ্ছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। ২০২৪ সালের বন্যায় দীর্ঘদিন পানিবন্দি হয়ে পড়ে ছিল মনোহরগঞ্জ ও লাকসামের লাখো মানুষ। ওই সময় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে তলিয়ে গেছে এ জনপদের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও একরের পর একর ফসলি জমি। যার মূল কারণ ছিল বিগত সরকারের অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া এ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের পথগুলো।

লাকসাম-মনোহরগঞ্জ উপজেলার পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ এ বেরুলা খাল। কুমিল্লা দক্ষিণাঞ্চলের জলাবদ্ধতার নেপথ্যে বেরুলা খাল অবৈধভাবে দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়াকেই মনে করছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়রা বলছেন, শাখা খাল, জলাধার ও নিম্নাঞ্চল দখল ও ভরাটের কারণে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতায় পড়ে দিনাতিপাত করে। এখনো প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন নালাগুলোয় দখলদারিত্ব চলছে। এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের জন্য শাখা খালসহ বেরুলা খালটিকে দখলমুক্ত করে নাব্য ও পানি নিস্কাশনের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, অতীতে এ খাল দিয়ে নৌকা করে নোয়াখালী থেকে লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজারে মালামাল আনা-নেওয়া করা হতো। পালতোলা নৌকায় করে পার হয়ে যাওয়া মাঝির কণ্ঠের সুর ভেসে আসত। খাল থেকে পানি নিতে আসা ঘোমটা দেওয়া গাঁয়ের বধূরা কান পেতে শুনতেন সে গান। খালের পানিতে মাছ শিকার করে সংসার চালাতেন স্থানীয় জেলেরা। তবে দখলে ও অপরিকল্পিত রাস্তা-ব্রিজ নির্মাণের কারণে খালের নেই কোনো অস্তিত্ব। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করা হয়েছে চার লেনের রাস্তার কাজ করতে গিয়ে। রাস্তার উন্নয়নের কাজ করতে গিয়ে খালটি ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ফলে সামনের বছরগুলোতে ফসল ফলানো নিয়ে চিন্তিত এই এলাকার কৃষকরা।
বেরুলা খালের সঙ্গে কুমিল্লার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোট, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী ও বেগমগঞ্জের বিভিন্ন শাখা খালের সংযোগ রয়েছে। এ খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিগত বছরের তুলনায় আরো বেশি বন্যা ও জলাবদ্ধতার কবলে পড়ার আশঙ্কা করছেন লাকসাম পৌরসভার ফতেপুর, উত্তকূল, উপজেলার উত্তরদা, আজগরা, গোবিন্দুপুর, মনোহরগঞ্জ উপজেলার খিলা, নাথেরপেটুয়া, বিপুলাসার ও নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী ও বেগমগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
তবে উল্টো চিত্র দেখা যায় লাকসাম উপজেলার অংশে চন্দনা বাজার এলাকায়। রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য এখানে জায়গা অধিগ্রহণে দেরি হওয়ায় চন্দনা বাজার অংশে প্রায় এক কিলোমিটার কাজ এখনো বাকি। লাকসাম থেকে সোনাইমুড়ী পর্যন্ত রাস্তার পূর্ব পাশে ৮০ শতাংশ খাল ভরাট করে চার লেন সম্প্রসারণ করলেও চন্দনা বাজার এলাকায় খাল ভরাট না করে পশ্চিম পাশে মালিকানা ভূমি অধিগ্রহণ করে আগের অধিগ্রহণকৃত জায়গা অবৈধভাবে দখল করার প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত রয়েছে ভূমিদস্যু একটি মহল।
অভিযোগ উঠেছে সওজের নামে রেকর্ডভুক্ত ও নামজারীকৃত প্রায় দেড় একর খালি জায়গা (রাস্তারপুর্ব পাশে) ভরাট না করে চার লেন সড়ক সম্প্রসারণে ঐতিহ্যবাহী বহু পুরোনো চন্দনা বাজার বিলুপ্তের পাঁয়তারা করছে ওই অসাধু চক্রটি। সড়কের গতিপথ পরিবর্তন এনে স্থায়ী অস্থায়ী শতাধিক স্থাপনা ভেঙে দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী, কর্মচারীসহ এতে দুই শতাধিক পরিবারের ক্ষতিসাধন করতে উঠে পড়ে লেগেছে তারা। শত বছরের পুরাতন চন্দনা বাজার অধিগ্রহণ ও বিলুপ্ত না করে মূল পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী চার লেন সড়ক সম্প্রসারণ করারও অনুরোধ জানান এখানকার দোকান মালিক বাজার ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী।

এ অঞ্চলের বিশিষ্টজন বলেন, শত বছরের প্রচীন এই খালটি ১৯৭৮ সালের দিকে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে সংস্কার করা হয়। খালটি দিয়ে নোয়াখালী থেকে নৌকা করে লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজারে মালামাল আনা-নেওয়া করা হতো। খালটি দখল করে ভরাটের কারণে এলাকার মানুষের বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হবে। সেচ সংকটে পড়বে ওই এলাকার কৃষি জমি। এতে এ এলাকার মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। খালের উপর অবৈধভাবে স্থাপনা গড়ে ওঠার কারণে দেখে বোঝার উপায় নাই যে এখানে একসময় খাল ছিল। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় নিচু স্তরের সড়কগুলো। একটু ঝুম বৃষ্টি হলেই এ অঞ্চলে নামে সীমাহীন দুর্ভোগ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খাল খনন ঘোষণা এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে আশার প্রদীপ দেখিয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী শতবছরের এ খালটিকে উদ্ধার করে জলাবদ্ধতা থেকে এতদাঞ্চলের মানুষকে রক্ষা করবে। এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন