যেখানে গড়ে ওঠার কথা আগামীর বাংলাদেশ, যেখানে শিশুদের হাসি আর দৌড়ঝাঁপে মুখর থাকার কথা—সেই স্কুল মাঠেই আজ ছড়িয়ে আছে আবর্জনার স্তূপ, দুর্গন্ধ আর অবহেলা। পটুয়াখালীর দশমিনা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কর্ণার এখন আর খেলার মাঠ নয়; এটি যেন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
পলিথিন, প্লাস্টিক, পচা খাবার ও নানা বর্জ্যের স্তূপে ঢেকে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন। বাতাসে ভাসছে অসহনীয় দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রবে সেখানে দাঁড়ানোই কষ্টকর। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে শরীরচর্চা ও খেলাধুলা করতে বাধ্য হচ্ছে, যা একপ্রকার নীরব নির্যাতনের শামিল বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।
দীর্ঘদিনের অবহেলা, বাড়ছে ঝুঁকি
সরেজমিন দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মাঠের ওই অংশটি প্রায় দেড় যুগ ধরে অবহেলায় পড়ে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পার্শ্ববর্তী কয়েকটি বহুতল ভবনের মালিক ও আশপাশের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিতভাবে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে আসছেন। ফলে জমে থাকা বর্জ্য থেকে বিষধর সাপসহ বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের আশঙ্কাজনক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
এই অবস্থায় বিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন বাড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। দায়িত্বশীলদের নীরবতায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও আতঙ্ক
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা কি মানুষ না? স্কুল মাঠে খেলব নাকি ময়লার সঙ্গে যুদ্ধ করব? যারা এখানে ময়লা ফেলে, তারা কি একবারও ভাবে—এখানে তাদের সন্তানও পড়তে পারত?
অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মিম আক্তার বলেন, ওই কর্ণারে গেলেই বমি ভাব আসে, মাথা ঘোরে। অনেক সময় বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়ের ভয়ে আমরা মেয়েরা সেখানে যেতেই পারি না। এই অবস্থায় আমাদের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব কে নেবে?
শিক্ষক ও সমাজের প্রশ্ন
দশমিনা উপজেলা ক্রীড়া অঙ্গনের বাফুফে সদস্য ও সংবাদকর্মী বেল্লাল হোসেন বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে দিনের পর দিন ময়লা পড়ে থাকে—তবু কারও টনক নড়ে না কেন? এটি কি নিছক অবহেলা, নাকি ইচ্ছাকৃত চোখ বন্ধ করে রাখা? আজ যদি শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলা হয়, আগামী দিনের দায় কে নেবে?
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (শারীরিক শিক্ষা) রফিকুল ইসলাম বাবুল বলেন, চাকরির শুরু থেকেই দেখে আসছি, পাশের দুইটি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা নিয়মিত এই মাঠে ময়লা ফেলে আসছেন। এর ফলে বিষধর সাপ ও নানা পোকামাকড়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আমি স্বাভাবিকভাবে শারীরিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারি না। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সালাউদ্দিন সৈকত বলেন, দশমিনা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। দুঃখজনক হলেও সত্য, পাশের মা গার্মেন্টস ও মল্লিক মার্কেটের ব্যবসায়ীরা প্রায় ১৫–১৬ বছর ধরে আমাদের মাঠের ওই অংশটিকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করছেন। একবার ইউএনওর নির্দেশে পাঁচ ট্রাক ময়লা অপসারণ করা হলেও কয়েক মাস পর আবার একই অবস্থা তৈরি হয়।
তিনি আরও জানান, একাধিকবার নিষেধ করার পরও ব্যবসায়ীরা বিষয়টি উপেক্ষা করছেন। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান তিনি।
প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমাকে জানানো হয়েছে। এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দাবি একটাই
শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর একটাই দাবি—অবিলম্বে ময়লার স্তূপ অপসারণ, স্কুল মাঠে ময়লা ফেলা বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং দায়ী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো আজ যে মাঠ ময়লায় ভরে যাচ্ছে, আগামীকাল সেই ময়লার ভারই চাপবে পুরো সমাজের ঘাড়ে।



