পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় সাত গুণ রোগী ভর্তি থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু ও তাদের স্বজনরা। হাম, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও ঠান্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে হাসপাতালে আসা অভিভাবকদের অনেককেই বেড না পেয়ে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার মান ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রোগীর স্বজনরা।
১২ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান ১০০ শয্যার পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে বর্তমানে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার অনেক বেশি। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা ওয়ার্ডে। ১৪টি বেডের বিপরীতে সেখানে ভর্তি রয়েছে ১০৫ জন শিশু রোগী। এর মধ্যে ৪২ জন হামে আক্রান্ত। এছাড়া নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, তীব্র জ্বর ও ঠান্ডাজনিত সমস্যায় আরও ৬৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
অতিরিক্ত রোগীর চাপে শিশুদের অনেককে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শুধু শিশু ওয়ার্ড নয়, হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডেও একই চিত্র। ৩৬ শয্যার মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন ৬৩ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে নতুন ভর্তি হয়েছেন আরও ৫৩ জন। অন্যদিকে ৩০ শয্যার পুরুষ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭০ জন রোগী এবং গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন আরও ৪২ জন। ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দা ও মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, বছরের পর বছর ধরে একই ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত বেড, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। দ্রুত নির্মাণাধীন ২৫০ শয্যার নতুন হাসপাতাল চালু হলে এই সংকট অনেকটাই কমবে বলে তাদের আশা।
শংকরপাশা এলাকার এক রোগীর স্বজন রাহাত ইসলাম বলেন, হাসপাতালে এসে বেড পাইনি। বাধ্য হয়ে শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এত ছোট বাচ্চাকে এভাবে রাখা খুবই কষ্টকর। দ্রুত বেডসংখ্যা ও চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।
শহরের টোনা এলাকার শিশু রোগী শাফিনের মা রেহেনা বেগম বলেন, আমার ছেলে কয়েকদিন ধরে জ্বর ও ঠান্ডায় ভুগছে। হাসপাতালে এনে ভর্তি করলেও বেড না পাওয়ায় মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। এতে শিশুকে ঠিকভাবে দেখাশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা দ্রুত নতুন হাসপাতাল চালুর দাবি জানাই।
রোগীর আরেক স্বজন সিদ্দিক আহমেদ বলেন, প্রতিদিনই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় বেড ও চিকিৎসক নেই। মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা রোগীদের জন্য খুবই দুর্ভোগের। নির্মাণাধীন ২৫০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুত চালু হলে আমরা সাধারণ মানুষ উপকৃত হবো।
পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স পপি হালদার বলেন, শিশু ওয়ার্ডে মাত্র ১৪টি বেড রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ১০৫ জন শিশু ভর্তি আছে। বেডের তুলনায় রোগী অনেক বেশি। আবার প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্টাফও নেই। তাই রোগীদের সেবা দিতে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সুজিত পাইক বলেন, ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগী ভর্তি রয়েছে। শুধু বেড নয়, চিকিৎসকেরও তীব্র সংকট রয়েছে। এখানে ৬২ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ থেকে ১৫ জন। সীমিত জনবল নিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৮৪ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে পিরোজপুর সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৯৭ সালে ৫০ শয্যার নতুন ভবন নির্মাণ করা হয় এবং ২০০৫ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়। বর্তমানে নির্মাণাধীন ২৫০ শয্যার আধুনিক জেলা হাসপাতাল দ্রুত চালু হলে জেলার স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিনের সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে মনে করছেন চিকিৎসাপ্রত্যাশীরা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন