× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

মতামত

সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী: রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির শক্তিশালী বার্তা

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত

সেনা মহড়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত

রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা থাকে, যা কেবল একটি সরকারি কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সময়ের পরিক্রমায় সেগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, প্রতীক এবং রাজনৈতিক-রাষ্ট্রীয় তাৎপর্যের বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিও তেমনই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ম পদাতিক ডিভিশনের অধীন ৮ বীর-এর প্রশিক্ষণ এলাকায় উপস্থিত হয়ে তিনি শুধু একটি সামরিক মহড়া প্রত্যক্ষ করেননি; বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদার দক্ষতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সরকারের অগ্রাধিকার ও প্রতিশ্রুতির একটি সুস্পষ্ট বার্তা তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর সম্পর্ক সবসময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সংকটের সময়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশের নিরাপত্তা রক্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

এই বাস্তবতায় একজন সরকারপ্রধানের সরাসরি প্রশিক্ষণ মাঠে উপস্থিতি নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি সেনাসদস্যদের দায়িত্ব, ত্যাগ ও পেশাগত দক্ষতার প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বহিঃপ্রকাশ। কারণ একটি বাহিনীর সক্ষমতা শুধু তার অস্ত্র বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার সদস্যদের মনোবল, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা এবং নেতৃত্বের ওপর।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তার মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি। তিনি নির্ধারিত স্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রশিক্ষণ এলাকার বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। তিনি ‘ফার্ম বেস’-এর বিভিন্ন অংশ পরিদর্শন করেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও ইউনিট কমান্ডারের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, কৌশলগত প্রস্তুতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেন।

একজন কমান্ডারের মৌখিক অপারেশনাল নির্দেশনা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সেনাসদস্যদের পরিচালিত রেইড মহড়া প্রত্যক্ষ করা ছিল এই সফরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি এই ইঙ্গিত দেয় যে, প্রধানমন্ত্রী কেবল একটি সৌজন্যমূলক পরিদর্শনে যাননি; বরং সেনাবাহিনীর বাস্তব প্রশিক্ষণ, যুদ্ধপ্রস্তুতি এবং কৌশলগত সক্ষমতা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন।

আধুনিক বিশ্বের নিরাপত্তা বাস্তবতা আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। এখন যুদ্ধ শুধু সীমান্তে সেনা মোতায়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, সাইবার হুমকি, তথ্যযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ এবং পরিবর্তিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি আধুনিক ও প্রস্তুত বাহিনী প্রয়োজন। তাই নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও বাস্তবভিত্তিক মহড়া একটি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উপাদান।

প্রধানমন্ত্রী মহড়ার সময় সেনাসদস্যদের অবস্থান গ্রহণ, রণকৌশল, সমরাস্ত্রের ব্যবহার এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিন্ন প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি সেনা বাঙ্কারে নেমে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চান। পাশাপাশি ছদ্মবেশে অবস্থানরত সেনাসদস্যদের কাছেও গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেন। একজন সরকারপ্রধানের এই ধরনের সরাসরি যোগাযোগ মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো- শুধু দপ্তরের নথি ও প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়া। একজন রাষ্ট্রনায়ক যখন মাঠে যান, তখন তিনি প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের কাছ থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে পারেন। এর মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও কার্যকর হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরের মধ্য দিয়ে সেই ধরনের মাঠভিত্তিক নেতৃত্বের একটি দৃষ্টান্ত দেখা গেছে।

এই সফরের মানবিক দিকটিও বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। প্রধানমন্ত্রী মহড়ায় অংশগ্রহণকারী সেনাসদস্যদের জন্য প্রস্তুত করা তাৎক্ষণিক খাবার গ্রহণ করেন এবং তাদের সঙ্গে চা পান করেন। সামরিক জীবনে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যরা অনেক সময় কঠিন পরিবেশে দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তাদের সঙ্গে একজন সরকারপ্রধানের স্বাভাবিক ও আন্তরিক আচরণ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

সেনাসদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের জনগণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওপর গভীর আস্থা রাখে। এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বাস্তবতা রয়েছে। কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে জনগণের আস্থা অর্জন করে তার দায়িত্বশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং কর্মদক্ষতার মাধ্যমে। সেই আস্থা অর্জন যেমন বড় সম্মানের বিষয়, তেমনি তা ধরে রাখাও বড় দায়িত্ব।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ, সরকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই জনগণের এই আস্থা আরও শক্তিশালী হয়। একইভাবে সরকারের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া এবং তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে পেশাদার প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা এবং সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আঞ্চলিক উত্তেজনা, নতুন ধরনের সামরিক প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তার পরিবর্তিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি দক্ষ ও প্রস্তুত বাহিনী অপরিহার্য। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ-বিগ্রহ আমাদের নতুন করে অনেক বার্তা দিয়ে গেল।

আজকের সফরের আরেকটি তাৎপর্য হলো- রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের আস্থার সম্পর্ককে দৃশ্যমান করা। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকার এবং প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীলতা, শ্রদ্ধা ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তিতে কাজ করে। এই সম্পর্ক যত বেশি প্রাতিষ্ঠানিক ও শক্তিশালী হবে, রাষ্ট্র তত বেশি স্থিতিশীল হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সেনা মহড়া পরিদর্শন তাই কেবল একটি সামরিক কর্মসূচি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় বার্তা। সেই বার্তা হলো- দেশের নিরাপত্তা, সেনাসদস্যদের মর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাঠে গিয়ে সেনাসদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁদের দায়িত্বের প্রতি সম্মান জানানো এবং তাঁদের প্রস্তুতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়ার মাধ্যমে তিনি নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন।

একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সামরিক সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এর ভিত্তি তৈরি হয় জনগণের আস্থা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং নেতৃত্বের দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে। সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়ার মাঠে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি সেই আস্থা, দায়িত্ব ও জাতীয় ঐক্যের একটি প্রতীকী প্রকাশ।

ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের এই ধরনের সরাসরি যোগাযোগ আরও কার্যকর প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ যে নেতৃত্ব মাঠের বাস্তবতা বোঝে, সে নেতৃত্বই জাতীয় স্বার্থে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

সেনা মহড়ার মাঠে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি তাই একটি দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বৃহত্তর বার্তা- রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা কাঠামোকে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেনাসদস্যদের পেশাদারিত্বকে সম্মান করছে এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সব প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Link copied!