× UCB Sticker Card
রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ১২:২১ এএম

প্রস্তাবিত ‘কবি নজরুল সিটি’, কল্পনার শহরের স্থানিক অবয়ব

রূপালী ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ১২:২১ এএম

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল। ছবি : সংগৃহীত

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল। ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি গণমাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি দূরদর্শী ঘোষণা আমাদের আশান্বিত করেছে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য ত্রিশালকে কেন্দ্র করে একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘নজরুল সিটি’ গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। টেলিভিশনের পর্দায় এই ঘোষণা শোনার পর একজন পেশাদার পরিকল্পনাবিদ হিসেবে অবিন্যস্ত ত্রিশালকে নিয়ে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নগুলো এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। 

আমাদের দেশে পূর্বাচল বা উত্তরার মতো নতুন আবাসিক এলাকা হয়েছে, নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে হাই-টেক সিটি বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও গড়ে উঠছে; কিন্তু কোনো বিখ্যাত চরিত্র, সাহিত্য, ইতিহাস বা সাংস্কৃতিক ভাবধারাকে কেন্দ্র করে পুরো শহরের অবয়ব, আইন ও স্থাপত্যশৈলী সাজানোর মতো কোনো ‘থিম সিটি’র নজির এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে নেই। তাই প্রস্তাবিত নজরুল সিটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানের ‘থিম-বেসড হেরিটেজ সিটি’।  

তবে এই ঐতিহাসিক রূপান্তরকে সার্থক করতে হলে, নজরুলের কিশোর বেলার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বটমূল, কাজির শিমলার দারোগা বাড়ি কিংবা সুতিয়া নদীর অববাহিকাকে ঘিরে আমাদের যে আবেগ, তাকে কেবল প্রথাগত ইট-পাথরের মাস্টারপ্ল্যানে বন্দি করলে চলবে না। হেরিটেজ টাউন গড়ে তোলার চিরাচরিত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং সর্বাধুনিক আইনি কাঠামোর মেলবন্ধনে একটি বৈজ্ঞানিক রূপরেখা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।  

সৌভাগ্যবশত, সম্প্রতি পাস হওয়া ‘স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬’ আমাদের হাতে এমন এক শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার তুলে দিয়েছে, যার সঠিক প্রয়োগে ত্রিশালকে একটি অনন্য গ্লোবাল আইডেন্টিটি দেওয়া সম্ভব। প্রথাগত ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে কীভাবে একটি তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক মিশ্র মডেলের মাধ্যমে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, তার একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা এখনই টেবিলে রাখা প্রয়োজন। 

পরিকল্পনার প্রাথমিক নিয়ম অনুযায়ী, পুরো ত্রিশাল উপজেলাকে ঢালাওভাবে ‘থিম শহর’ বানানো যাবে না, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ল্যান্ড-ইউজ গাইডলাইন তৈরি করে মূল ‘নজরুল সিটি’কে গড়ে তুলতে হবে কিছু স্ট্র্যাটেজিক জোনের সমন্বয়ে, যাকে পরিকল্পনার ভাষায় আমরা বলি ‘কোর অ্যান্ড নোডাল নেটওয়ার্ক’। 

যেহেতু ত্রিশাল একটি বহুমাত্রিক এলাকা, যেখানে নদী, ঐতিহাসিক স্মৃতিকেন্দ্র, গ্রামীণ কৃষি প্রতিবেশ এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিদ্যমান; তাই একক কোনো বৈশ্বিক শহরের নকশা হুবহু কপি করা এখানে ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমাদের প্রয়োজন একটি ‘হাইব্রিড বা মিশ্র মডেল’। 

বিশ্বজুড়ে সফল হওয়া বিভিন্ন বিখ্যাত থিম-বেসড শহরের স্থানিক ও অর্থনৈতিক কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভন যেভাবে শেকসপিয়রের জন্মস্থানকে কালচারাল ইকোনমির কেন্দ্রে রূপান্তর করেছে, কিংবা, ডেনমার্কের ওডেন্স যেভাবে হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের রূপকথাকে শহরের অবয়বে ধারণ করেছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা ত্রিশালের প্রবেশদ্বার ও সড়কদ্বীপে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ক্যালিগ্রাফি বা ‘ঝিঙে ফুল’ মোটিফের থিম-বেসড আরবান আর্কিটেকচার যুক্ত করতে পারি। 

মূল হেরিটেজ জোন ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কগুলোকে মোটরযান-মুক্ত বা ‘কার-ফ্রি’ করে ফুটপাতে আধুনিক পিচের বদলে ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির ইট (টেরাকোটা টাইলস) ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে খোদাই করা থাকবে কবির গানের স্বরলিপি ও কবিতা। রাস্তার দু’পাশে থাকবে ঝিঙে ফুল ও পদ্মের সমাহার এবং আধুনিক দৃষ্টিকটু সোডিয়াম লাইটের পরিবর্তে কবির ‘ধূমকেতু’ ও ‘চাঁদ’-এর থিমে তৈরি নান্দনিক এলইডি ল্যাম্পপোস্ট। 

একটি টেকসই শহরের প্রাণভোমরা হলো তার জল ও সবুজের ভারসাম্য। ত্রিশালের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সুতিয়া নদী আজ দখল ও দূষণে জর্জরিত হলেও একে কেন্দ্র করে নেদারল্যান্ডসের গিটহর্ন শহরের আদলে ‘ব্লু-গ্রিন নেটওয়ার্ক’ ও ‘স্পঞ্জ সিটি’ কনসেপ্ট বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যা শহরকে চিরতরে জলাবদ্ধতা ও দূষণমুক্ত রেখে ইকো-ট্যুরিজম চাঙ্গা করবে। শহরের ফুটপাথ ও পার্কিং এলাকায় পানিভেদ্য উপাদান ব্যবহার করে বৃষ্টির পানি সরাসরি ভূগর্ভে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকবে। 

ঠিক একইভাবে, ব্রাজিলের কুরিতিবা শহরের আদলে এখানে কোনো খোলা বা নোংরা ডাস্টবিন থাকবে না; রাস্তার মোড়ে মোড়ে থাকবে নজরুলের বই বা বাঁশির মোটিফে তৈরি মাটির নিচের ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়েস্ট চুটস’। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি জিরো-ল্যান্ডফিল ও সার্কুলার ইকোনমি মডেল যুক্ত করে ‘সবুজ টিকিট’ প্রথা চালু করা যায়, যেখানে নাগরিক বা শিক্ষার্থীরা উৎসেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে বুথে জমা দিলে শহরের পরিবেশবান্ধব ইভি শাটল বাস বা নৌকার ফ্রি টিকিট কিংবা রিওয়ার্ড পয়েন্ট পাবেন। 

নগরায়ণের তীব্র বাণিজ্যিক আগ্রাসন থেকে ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হলে আমাদের জাপানের কিয়োটো এবং ভারতের উদয়পুর শহরের মতো কঠোর উচ্চতা ও রঙ নিয়ন্ত্রণ আইনের আশ্রয় নিতে হবে। ‘স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬’-এর ধারা ২(ঝ) ও ২(ঞ) ব্যবহার করে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা পরিষদের মাধ্যমে ত্রিশালকে ‘বিশেষ স্থানিক পরিকল্পনা এলাকা’ ঘোষণা করা এখন প্রথম আইনি পদক্ষেপ। 

একই সাথে আইনের ধারা ৭(২) অনুযায়ী ঐতিহাসিক স্মৃতিকেন্দ্রগুলোর চারপাশে একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধ পর্যন্ত ‘হেরিটেজ বাফার জোন’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন বা কলকারখানা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। আর এই বাফার জোনের ভেতরের বেসরকারি জমির মালিকদের অর্থনৈতিক অধিকার সুরক্ষায় আমরা প্রবর্তন করতে পারি আধুনিক ‘হেরিটেজ ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর) মডেল’। এর অধীনে কোনো মালিক ঐতিহ্যের স্বার্থে তাঁর জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের অধিকার ত্যাগ করলে, তাঁকে শহরের অন্য কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক বা আবাসিক জোনে অতিরিক্ত উচ্চতা বা ফ্লোর এরিয়া রেশিও ব্যবহারের আইনি ‘উন্নয়ন অধিকার সার্টিফিকেট’ দেওয়া হবে, যার ফলে কোনো উচ্ছেদ বা সামাজিক অসন্তোষ ছাড়াই ঐতিহাসিক এলাকা সংরক্ষণ সম্ভব হবে। 

এছাড়া কিয়োটোর মতো কঠোর সাইনেজ আইন প্রবর্তন করে চটকদার প্লাস্টিক বা নিয়ন সাইন বোর্ড নিষিদ্ধ করে সমস্ত বাণিজ্যিক সাইনেজ কাঠের বা মেটালের এবং নজরুল একাডেমির অনুমোদিত হেরিটেজ থিমের রঙের সাথে মিল রেখে করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। 

একটি মেগা প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভূমি অধিগ্রহণ ও স্থানীয় মানুষের উচ্ছেদজনিত অসন্তোষ। নজরুলের মূল দর্শনই ছিল সাম্যবাদ ও সমঅধিকার; তাই তাঁর স্মৃতির শহরটি যেন কোনো সাধারণ মানুষকে ভিটেমাটিহীন না করে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়ামসবার্গ শহরের মতো ‘ল্যান্ড পুলিং’ মডেল আমাদের জন্য রক্ষাকবচ হতে পারে। এই মডেলে স্থানীয় সাধারণ মালিকদের অনুন্নত জমি একত্র করে সেখানে পরিকল্পিত রাস্তা, ড্রেনেজ, পার্ক ও নজরুল সিটির থিম-অবকাঠামো তৈরি করার পর জমির একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন: ৪০-৬০%) উন্নত বাণিজ্যিক বা আবাসিক প্লট হিসেবে মূল মালিকদেরই ফেরত দেওয়া হবে। 

পরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ভূমি মালিকের জমির পরিমাণ সামান্য কমলেও তার বাজারমূল্য আগের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং কালচারাল মার্কেটপ্লেস বা থিম পার্কে তাঁদের অংশীদারিত্ব ও দোকান বরাদ্দে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে তারা এককালীন কিছু টাকা পেয়ে সর্বস্বান্ত হবেন না, বরং আজীবন এই শহরের অর্থনৈতিক সুফলের অংশীদার থাকবেন, যা আইনের ধারা ৭(২)-এর বাস্তুচ্যুতি এড়ানোর বাধ্যবাধকতাকে শতভাগ পূরণ করে। 

একই সাথে, ত্রিশালের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়কে আইনের ধারা ২(ড) অনুযায়ী একটি সুনির্দিষ্ট ‘নলেজ অ্যান্ড ইনোভেশন জোন’ হিসেবে ডিজাইন করতে হবে, যার পাশে থাকবে একটি আইকনিক নজরুল কনভেনশন সেন্টার, থিয়েটার ও আর্ট গ্যালারি। 

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের তীব্র ট্রাফিক চাপ সামলাতে একটি সমন্বিত ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্টেশন প্ল্যান করে শহরের ভেতরে বাইপাস রোড এবং মহাসড়ক থেকে মূল হেরিটেজ জোনে প্রবেশের জন্য পরিবেশবান্ধব শতভাগ বৈদ্যুতিক শাটল ইভি বাস সার্ভিস চালু করা জরুরি। 

এই সামগ্রিক মহাপরিকল্পনা যেন শুধুমাত্র কাগজের দলিলে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য স্থানিক পরিকল্পনা আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী গঠিত ‘জেলা স্থানিক পরিকল্পনা কমিটি’র কারিগরি উইংয়ের অধীনে একটি ডেডিকেটেড ‘নজরুল সিটি বাস্তবায়ন সেল’ গঠন করা যেতে পারে, এবং ল্যান্ড-ইউজ ট্র্যাকিংয়ের জন্য স্যাটেলাইট ইমেজ ও জিআইএস ভিত্তিক রিয়াল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম চালু করতে হবে। 

এই আইনের ধারা ১১ ও ১২ অনুযায়ী, পরিকল্পনা লঙ্ঘনের দায়ে অনধিক ২ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের যে কঠোর বিধান রয়েছে, তা এই শহরের মাস্টারপ্ল্যানকে শতভাগ আইনি সুরক্ষা দেবে। 

সর্বোপরি এমন একটি শহরের স্বপ্ন দেখছি, যা শুধু ইট, কাঠ আর পাথরের নিষ্প্রাণ জ্যামিতিক নকশা হবে না; বরং যেখানে প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি ইটের গাঁথুনি আর নদীর কলতান মনে করিয়ে দেবে নজরুলের সাম্য, প্রেম ও দ্রোহের কথা। একটি আন্তর্জাতিক মানের ‘হেরিটেজ সিটি’র সার্থকতা তখনই, যখন তা তার নিজস্ব ইতিহাস ও প্রতিবেশকে অক্ষুণ্ণ রেখে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। 

এই সময়োপযোগী উদ্যোগের সাথে যদি আমাদের দেশের নগর পরিকল্পনাবিদদের বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক দূরদর্শিতার একাত্মতা ঘটে, তবে ত্রিশাল কেবল বাংলাদেশের মানচিত্রে একটি নতুন বিন্দু হবে না, বরং তা বিশ্বমঞ্চে টেকসই, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনার একটি ধ্রুবতারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। নজরুল সিটির এই স্থানিক রূপান্তর তাই কেবল একটি প্রজেক্ট নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও মননের এক অবিনশ্বর স্মারক।

লেখক: ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল
সদস্য সচিব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স, ময়মনসিংহ জেলা।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!