× UCB Sticker Card
বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ড. মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম

মতামত

তিস্তার নতুন দিগন্ত: মহাপরিকল্পনায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও ভূরাজনীতি

ড. মো. মিজানুর রহমান

প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও কূটনৈতিক সফলতার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা, ধারাবাহিক আলোচনা এবং একাধিক পর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিস্তা নদীর ন্যায্য পানি বণ্টন ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কার্যকর সমাধান আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার উদ্যোগ নিলেও উজান–ভাটির জটিলতা, আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের, বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা ইতিহাসে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। একই সঙ্গে চীনের গঠনমূলক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের আগ্রহ দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা কাটিয়ে একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা আজ উন্নয়ন কূটনীতির নতুন অধ্যায় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতি, কৃষি নিরাপত্তা এবং উত্তরাঞ্চলের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা এবং অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক জলধারা নয়, বরং কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে গত কয়েক দশকে উজানে পানি প্রত্যাহার, নদী নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সম্প্রসারণ, মৌসুমি প্রবাহের তীব্র বৈষম্য, নদীভাঙন, পলি জমা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তিস্তা তার স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাণশক্তি হারিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রংপুর বিভাগের কৃষি উৎপাদন, সেচব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে। ফলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং জাতীয় কৌশলগত উন্নয়ন ও পানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তিস্তা নদীর উৎস ভারতের সিকিম অঞ্চলের হিমালয় সংলগ্ন হ্রদ ও হিমবাহ অঞ্চল। সেখান থেকে নদীটি দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাছে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়। এর মোট দৈর্ঘ্যের অধিকাংশই ভারতের ভেতরে অবস্থিত, আর বাংলাদেশে প্রবাহিত অংশ প্রায় ১১৫ কিলোমিটার। ঐতিহাসিকভাবে ১৭৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর নদীর গতিপথে বড় পরিবর্তন ঘটে, যা উত্তরবঙ্গের ভূগঠন ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি প্রবাহে বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি—এই দুই চরম অবস্থাই তিস্তা অববাহিকার স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে তিস্তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বোরো ধান, ভুট্টা, আলু, গম, সরিষা ও শাকসবজি উৎপাদনে এই নদীর পানি প্রধান সেচ উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতির কারণে কৃষকরা এখন ব্যাপকভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে নদীর মৎস্যসম্পদ হ্রাস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়া উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

স্বাধীনতার পর নীলফামারীর ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারেজ নির্মিত হয় সেচ সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে। তবে উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে ব্যারেজে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি পলি জমা, নদীতলের উচ্চতা বৃদ্ধি, রক্ষণাবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রকল্পটির কার্যকারিতা আরও কমিয়ে দিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয় যে কেবল একটি ব্যারেজ নির্ভর সমাধান তিস্তার জটিল সমস্যার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে একটি অমীমাংসিত কূটনৈতিক বিষয়। দুই দেশ ১৯৭২ সালে যৌথ নদী কমিশন গঠন করে আলোচনার মাধ্যমে অভিন্ন নদীগুলোর ব্যবস্থাপনা এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ১৯৮৩ সালে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতায় শুষ্ক মৌসুমে পানির বণ্টনের একটি কাঠামো নির্ধারিত হয়, তবে তা স্থায়ী বা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ছিল না। পরবর্তীতে ২০১১ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক জটিলতার কারণে এটি স্বাক্ষরিত হয়নি। ফলে আজও তিস্তা পানি বণ্টন একটি দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের জন্য এই ইস্যু শুধুমাত্র পানির ভাগ নয়, বরং কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনায় ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার, কোনো রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার নীতি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক জলধারা কনভেনশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নীতিমালায় এই নীতিগুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। যদিও বাংলাদেশ এই নীতিগুলোর পক্ষে অবস্থান নেয়, ভারত এখনো এই কনভেনশনের সদস্য নয়, ফলে এটি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। তবুও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে, আন্তঃসীমান্ত নদীর বিরোধ সাধারণত আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হয়, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নয়।

উজানের গজলডোবা ব্যারাজের পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে তিস্তার প্রবাহ অত্যন্ত কমে যায়, যার ফলে উত্তরাঞ্চলে সেচ সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। কৃষকরা বিকল্প হিসেবে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হন, যা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি প্রবাহে আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন এবং ফসলহানির মতো দুর্যোগ নিয়মিত ঘটছে। এর ফলে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহচক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে পুরো অববাহিকায় এক ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও জনজীবনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উভয় পর্যায়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক, উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফর এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তিস্তা ইস্যু নিয়মিতভাবে উত্থাপিত হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে নদী পুনঃখনন, ব্যারেজ আধুনিকীকরণ, নদীতীর সংরক্ষণ, পানি সংরক্ষণ এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা একটি বড় আকারের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে, যা নদী পুনরুদ্ধার, সেচ সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তন, পানির চাহিদা বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে তিস্তা সমস্যার সমাধান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতের টেকসই সমাধান কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা এবং অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তির সমন্বয়ে এগোতে পারলেই তিস্তা নদী আবারও উত্তরাঞ্চলের জন্য টেকসই জীবনরেখা হয়ে উঠতে পারে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট, নদীভাঙন, কৃষি অনিশ্চয়তা এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে একটি সমন্বিত ও বহুমাত্রিক উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিস্তা নদী হিমালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি প্রবাহে বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট—এই দুই চরম পরিস্থিতির কারণে নদী অববাহিকায় দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় শুধু সেচ বা বাঁধকেন্দ্রিক সমাধান নয়, বরং নদীকে কেন্দ্র করে সমন্বিত অবকাঠামো, বসতি, অর্থনীতি ও পরিবেশ পুনর্গঠনের ধারণা সামনে এসেছে।

মহাপরিকল্পনার মূল ধারণা এখন আর শুধু নদীর পানি নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নেই; বরং নদীকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নদীভিত্তিক উন্নয়ন করিডর’ গড়ে তোলার চিন্তা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নদীর দুই পাড়ে পরিকল্পিত বসতি স্থাপন, নতুন স্থলভাগ বা রিভারব্যাংক ল্যান্ড পুনর্গঠন, কৃষি ও নগর উন্নয়ন, পর্যটন অবকাঠামো, বনায়ন এবং পরিবেশগত পুনরুদ্ধার। পরিকল্পিতভাবে নদীর দুই তীরে বসতি ও নগরায়ণ গড়ে উঠলে বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত চর দখল ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ কাঠামোর মধ্যে চলে আসতে পারে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকি কমবে এবং মানুষ নিরাপদ আবাসন সুবিধা পাবে।

নদীর দুই পাশে স্থলভাগ পুনর্গঠন ও ভূমি উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন কৃষিজমি ও ব্যবহারযোগ্য এলাকা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নদী খনন ও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে পলি জমা থেকে তৈরি নতুন চরভূমি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এসব নতুন ভূমিতে আধুনিক কৃষি, ফল বাগান, সবজি চাষ এবং মৎস্যচাষের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন বহুগুণে বাড়বে এবং উত্তরাঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে ভূমি ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তিস্তা অববাহিকাকে কেন্দ্র করে পর্যটন খাতের বিকাশ একটি বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নদীর সৌন্দর্য, চরভূমি, জলপ্রবাহ এবং সবুজায়িত তীরভূমিকে কেন্দ্র করে ইকো-ট্যুরিজম, রিভার ক্রুজিং, ক্যাম্পিং, ফিশিং জোন, পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। পরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্রগুলো স্থানীয় অর্থনীতিকে বহুমুখী করবে এবং ছোট ব্যবসা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও হস্তশিল্প খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোতে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎসে পরিণত হতে পারে।

এই পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শরায়ন বা নদীপথভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। তিস্তার নাব্যতা পুনরুদ্ধার হলে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থা পুনরায় সক্রিয় করা সম্ভব হবে। নদীপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় সড়ক বা রেলপথের তুলনায় অনেক কম, ফলে কৃষিপণ্য, নির্মাণ সামগ্রী ও শিল্পপণ্য পরিবহন আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। এতে লজিস্টিক খরচ কমে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে নদীকেন্দ্রিক বন্দর ও ঘাট ব্যবস্থার উন্নয়ন নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরি করবে।
পরিবেশগত দিক থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বৃহৎ আকারে বনায়ন এবং ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে। নদীর দুই তীরে সবুজ বেষ্টনী বা গ্রিন বেল্ট তৈরি করলে মাটি ক্ষয়, ভাঙন এবং ধূলিঝড়ের ঝুঁকি কমবে। স্থানীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়তা করবে এবং কার্বন শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার হলে মাছ, জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদের প্রজনন ক্ষেত্র পুনরুজ্জীবিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এই বহুমাত্রিক উন্নয়নের অর্থনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত ব্যাপক হতে পারে। প্রথমত, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী হবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমবে। দ্বিতীয়ত, পর্যটন, কৃষি, মৎস্য, পরিবহন ও শিল্প—সব খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখবে। তৃতীয়ত, ভূমির ব্যবহার দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে নতুন নগর ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে উঠবে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতিকে গতিশীল করবে। চতুর্থত, নদীভাঙন কমে গেলে প্রতিবছর বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়বে। পঞ্চমত, পরিবেশ উন্নত হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে এবং জীবনমান উন্নত হবে।

সব মিলিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়; এটি একটি নদীভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর পরিকল্পনা। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সুশাসন, পরিবেশ সুরক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ণ, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তিস্তা অববাহিকা বাংলাদেশের একটি নতুন অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে, যা কৃষি, পর্যটন, পরিবেশ এবং বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই দেশের প্রবৃদ্ধিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

Link copied!