ইতিহাসে কিছু নির্বাচন আছে, যেগুলো কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়; বরং একটি জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। ১৯৬০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল তেমনই এক ঘটনা। সেই নির্বাচন আজও আলোচিত শুধু এ কারণে নয় যে জন এফ. কেনেডি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন; বরং এ কারণে যে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিচার্ড নিক্সন পরাজয়ের মুহূর্তে এমন এক রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন, যা গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
একদিকে ছিলেন তরুণ, প্রাণবন্ত ও ক্যারিশম্যাটিক জন এফ. কেনেডি—নতুন প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। অন্যদিকে ছিলেন অভিজ্ঞ ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন—রাষ্ট্র পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতার অধিকারী। নির্বাচনী প্রচারণা ছিল তীব্র, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং কখনও কখনও অত্যন্ত কঠোর। উভয় পক্ষই একে অপরের নীতি, কর্মসূচি ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। টেলিভিশন বিতর্কে লাখো মানুষ তাঁদের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি প্রত্যক্ষ করেছে।
শেষ পর্যন্ত কেনেডি অতি সামান্য ব্যবধানে বিজয়ী হন। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কিছু অঙ্গরাজ্যে প্রশ্নও ওঠে। নিক্সনের অনেক সমর্থক বিশ্বাস করতেন, আইনি লড়াইয়ে গেলে ফলাফল পরিবর্তনের সুযোগ থাকতে পারে। কিন্তু নিক্সন অন্য পথ বেছে নিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও আইনি সংঘাত দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং জাতিকে অপ্রয়োজনীয় বিভাজনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তাই তিনি পরাজয় মেনে নিলেন।
সেই মুহূর্তে হয়তো তিনি ক্ষমতা হারিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি গণতন্ত্রকে জিততে দিয়েছিলেন।
আর ইতিহাসের পরিহাসই হোক বা পুরস্কার—আট বছর পর তিনিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
এই ঘটনায় লুকিয়ে আছে গণতন্ত্রের এক গভীর শিক্ষা। নির্বাচনে পরাজয় রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়, যেমন বিজয়ও ক্ষমতার ওপর স্থায়ী মালিকানা নয়। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, এখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে; নেতা নয়, নিয়মের ধারাবাহিকতাই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়।
প্রকৃতপক্ষে পরিণত গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈধতার বিরুদ্ধে নয়। তারা একে অপরের বিরোধিতা করে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করার জন্য নয়। তারা জানে, সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে হবে।
ইতিহাসে এর আরও অনেক উজ্জ্বল উদাহরণ রয়েছে।
মার্কিন গৃহযুদ্ধের অগ্নিঝরা সময়ে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তার মন্ত্রিসভায় এমন কয়েকজনকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যারা একসময় তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, সংকটের সময় ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, জাতীয় স্বার্থই প্রধান। রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে ভিন্নমতের মানুষকেও সঙ্গে নিতে হয়। নেতৃত্বের প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়; বরং যোগ্য মানুষদের জাতীয় কল্যাণে একত্রিত করার মধ্যে।
একই শিক্ষা আমরা পাই দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন থেকে। দীর্ঘ বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর তিনি চাইলে প্রতিশোধের রাজনীতি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে প্রতিহিংসা নতুন ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, আর পুনর্মিলনই পারে নতুন জাতি গড়তে। তাই তিনি বিভক্ত দক্ষিণ আফ্রিকাকে প্রতিশোধের পথে নয়, সহাবস্থান ও পুনর্মিলনের পথে পরিচালিত করেছিলেন। এ কারণেই তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; রাষ্ট্রনায়কত্বের এক বিশ্বজনীন প্রতীক।
ব্রিটেনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যও একই সত্যের সাক্ষ্য দেয়। উইনস্টন চার্চিল এবং ক্লেমেন্ট অ্যাটলি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিনিধি। তবুও নির্বাচন শেষে ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তর হয়েছে, রাষ্ট্রের বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। মতপার্থক্য সেখানে গণতন্ত্রকে দুর্বল করেনি; বরং আরও প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের ইতিহাস এই আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফ্রান্স ও জার্মানি ছিল ইউরোপীয় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের বৈরিতা দুটি বিশ্বযুদ্ধের জন্ম দেয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটায় এবং একটি মহাদেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। ইতিহাসের গতিপথ বিবেচনায় মনে হওয়ার কথা ছিল—এই শত্রুতা কখনও শেষ হবে না।
কিন্তু ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেন দূরদর্শী কিছু নেতা।
পশ্চিম জার্মানির কনরাড অ্যাডেনাওয়ার এবং ফ্রান্সের শার্ল দ্য গল উপলব্ধি করেছিলেন যে অতীতের রক্তক্ষয়ী স্মৃতি আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। তাই তারা শত্রুতার পরিবর্তে সহযোগিতা, প্রতিশোধের পরিবর্তে পুনর্মিলন এবং সন্দেহের পরিবর্তে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলেন। তাঁদের সেই রাজনৈতিক সাহস ও দূরদর্শিতা থেকেই জন্ম নেয় ইউরোপীয় একীকরণের ধারণা, যার পরিণত রূপ আজকের ইউরোপীয় ইউনিয়ন। একসময়ের যুদ্ধরত প্রতিবেশীরা পরিণত হয় উন্নয়ন, শান্তি ও সমৃদ্ধির অংশীদারে।
এই সমস্ত উদাহরণের মধ্য দিয়ে একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—কোনো মর্যাদাবান রাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করে গড়ে ওঠে না। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় তখনই, যখন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়; যখন আইন ব্যক্তি বা দলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে; যখন প্রতিযোগিতা থাকে, কিন্তু শত্রুতা নয়; যখন মতভেদ থাকে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যও থাকে।
বাংলাদেশের জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, মানবসম্পদ বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ নতুন এক সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে পৌঁছাতে কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর জবাবদিহি, আইনের শাসন, নীতিনির্ভর শাসনব্যবস্থা এবং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয় না।
যে সমাজে প্রতিটি নির্বাচনকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখা হয়, যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা হয় এবং যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনকে প্রতিশোধের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—সেখানে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে, মেধা নিরুৎসাহিত হয় এবং জাতীয় শক্তি উন্নয়নের পরিবর্তে সংঘাতে ব্যয় হয়।
অথচ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে ভিন্নমতকে ধারণ করার ক্ষমতায়। বিরোধী মত গণতন্ত্রের জন্য হুমকি নয়; বরং তার নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং সুশাসন আসে প্রতিযোগিতা থেকে; একমত হওয়া থেকে নয়।
সেই কারণেই কেনেডি–নিক্সনের নির্বাচন আজও শুধু আমেরিকার ইতিহাস নয়; এটি গণতন্ত্রের ইতিহাসেরও এক অনন্য অধ্যায়। এটি আমাদের শেখায়, গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা বিজয়ের মুহূর্তে নয়, বরং পরাজয়ের মুহূর্তে। বিজয় জনপ্রিয়তার পরিচয় বহন করতে পারে, কিন্তু পরাজয়কে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রনায়কত্বের পরিচয় দেয়।
একইভাবে বিজয়ীদের জন্যও একটি পরীক্ষা থাকে। তারা কি উদার হবেন, নাকি প্রতিশোধপরায়ণ? তারা কি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবেন, নাকি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতাকে? তারা কি জাতিকে একত্রিত করবেন, নাকি বিভক্ত করবেন? ইতিহাস শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজে।
ইতিহাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—কোনো জাতি তখনই সম্মানিত ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে, যখন জাতীয় স্বার্থ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পায়; যখন প্রতিষ্ঠান সাময়িক রাজনৈতিক বিজয়ের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে; এবং যখন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা অতীতের ক্ষোভকে অতিক্রম করে যায়।
বাংলাদেশের আগামী দিনের সাফল্য নির্ভর করবে কেবল কে ক্ষমতায় আছে তার ওপর নয়; বরং কতটা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গণতান্ত্রিক পরিপক্বতায় রূপ নিতে পারে, কতটা রাজনৈতিক মতভেদ জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে এবং কতটা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপর।
কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে, যারা ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার কথা ভেবেছেন; যারা প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার চেয়ে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার কথা ভেবেছেন; এবং যারা উপলব্ধি করেছেন—কোনো রাজনৈতিক দল, কোনো সরকার কিংবা কোনো নেতা নয়, একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রতিষ্ঠান, তার মূল্যবোধ এবং তার ভবিষ্যতের পথনকশা।
লেখক : কাজী জিয়া উদ্দিন
ডিআইজি (অবসরপ্রাপ্ত)

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন