× UCB Sticker Card
শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুন ২৭, ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

মতামত

ভূরাজনীতির নতুন দিগন্তে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ!

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুন ২৭, ২০২৬, ১০:৩২ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় চীন সফরটি কেবল ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় নয়; বরং এটি এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা, যেখানে বাংলাদেশ নিজেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ, বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারত্বের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করার সুযোগ পাচ্ছে।

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনীতির আকারে নির্ধারিত হয় না; বরং তা নির্ভর করে সে কতটা দক্ষতার সঙ্গে বহুমাত্রিক কূটনীতি পরিচালনা করতে পারে তার ওপর। সংযোগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল, বন্দর এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাই আজ নতুন ভূরাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ককে "নতুন ধাপে উন্নীত" করার ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন।
এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।

এই সফরে ঘোষিত ১৪ দফার যৌথ ইশতেহার, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়নে চীনের আগ্রহ, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহযোগিতা, শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণে সমর্থন এবং বহুল আলোচিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে আলোচনা—সব মিলিয়ে এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে ঘিরে একটি নতুন কৌশলগত সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে।

বিশ্বব্যবস্থায় এখন প্রতিযোগিতা মূলত সংযোগের। যে দেশ যত বেশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে, ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে তার অবস্থান তত শক্তিশালী হবে। ইউরোপে আন্তঃদেশীয় করিডর যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করেছে, তেমনি এশিয়ায় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্র নির্মাণ করছে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন সুযোগগুলো কাজে লাগানো যায়।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের ধারণা নতুন নয়। একসময় বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডর নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভারতের আপত্তির কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগোতে পারেনি। এখন ভারতকে বাদ দিয়ে চীনের নতুন করিডর পরিকল্পনা মূলত ইউনানের কুনমিং থেকে ম্যান্ডালে, কিয়াউকপিউ হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই সামনে এসেছে।

সুতরাং এই করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সামনে বহুমাত্রিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাবে পরিণত হতে পারে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নতুন শিল্প বিনিয়োগ বাড়তে পারে। বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্যের জন্য চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজারে প্রবেশ আরও সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে সড়ক, রেল, সমুদ্রবন্দর ও বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেও আরও গতিশীল করবে।

এই করিডরের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়; কৌশলগতও। বর্তমান ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতিতে সরবরাহ শৃঙ্খল, বিকল্প বাণিজ্যপথ এবং আঞ্চলিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একটি স্বাভাবিক সংযোগকেন্দ্র। এই অবস্থানকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতাও বিবেচনা করতে হবে। প্রস্তাবিত করিডরের একটি অংশ মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল অতিক্রম করবে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়নে চীনের আগ্রহও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আধুনিক বন্দর শুধু পণ্য ওঠানামার স্থান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রবেশদ্বার। দ্রুত লজিস্টিক ব্যবস্থা, কম পরিবহন ব্যয় এবং উন্নত বন্দর ব্যবস্থাপনা বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দুই বন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হলে বাংলাদেশ শুধু নিজের চাহিদা পূরণ করবে না; বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি কার্যকর সামুদ্রিক সেবা কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে আধুনিক প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৌশল সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ এবং পানি নিরাপত্তায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

চীনের শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য একটি বড় সুযোগ। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিপণ্য, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিশেষ করে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এই সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু অর্থনীতি নয়; স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি এবং ডিজিটাল সহযোগিতার বিষয়েও এই সফরে নতুন সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং গবেষণা সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশ এই সফরে আবারও "এক চীন নীতি"-র প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা। একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। পারস্পরিক আস্থা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা। চীন যেমন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান, আসিয়ান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হবে না; বরং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সবার সঙ্গে সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করবে। এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আজকের বিশ্বে "বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, বৈরিতা কারও সঙ্গে নয়"—এই নীতির আধুনিক রূপ হলো বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব। বাংলাদেশ যদি একই সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ—সব দিকের অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তাহলে দেশটি সত্যিকার অর্থেই একটি আঞ্চলিক সংযোগকেন্দ্রে পরিণত হবে।

ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার ক্ষেত্রে চীনের সমর্থনও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া মানে শুধু কূটনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধি নয়; বরং নতুন বিনিয়োগ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সুযোগের দ্বার উন্মুক্ত হওয়া।

ভূরাজনীতির প্রতিটি পরিবর্তনই কিছু দেশের জন্য সংকট, আবার কিছু দেশের জন্য সুযোগ হয়ে আসে। বাংলাদেশ আজ সেই সুযোগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।

পরিশেষে বলতে চাই,প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশ আর কেবল আঞ্চলিক রাজনীতির দর্শক নয়; বরং ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অংশীদারে পরিণত হচ্ছে। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রকল্প নির্বাচন এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক প্রজ্ঞা।

কারণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য নয়, বরং সংযোগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারত্বের শক্তিতে এশিয়ার অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সুতরাং আমি মনে করি,বেইজিং সফরের প্রকৃত সাফল্য তখনই নিশ্চিত হবে, যখন এই কূটনৈতিক অর্জন দেশের প্রতিটি মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনমানের ভিত্তি রচনা করবে। সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়ে উঠবে প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রা।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

Link copied!