× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ১০:২৪ পিএম

বন্ধ শিল্পে নতুন প্রাণের সন্ধান: অর্থনীতির পুনর্জাগরণে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬, ১০:২৪ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে আজ একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত সমস্যাও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক বন্ধ, রুগ্ন ও অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বছরের পর বছর ধরে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো উৎপাদনের বাইরে অবস্থান করছে। কোথাও যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়েছে, কোথাও অব্যবহৃত পড়ে আছে মূল্যবান শিল্পজমি, আবার কোথাও অচল অবকাঠামো রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় সরকার যদি এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে তা শুধু শিল্প খাত নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি বড় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প-কারখানা চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। এরপর ৪ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বন্ধ কারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক সভায় তিনি পুনরায় বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভায় বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি অলাভজনক সরকারি কারখানাগুলোর জমি ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রোড শো আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। সবশেষ তিনি গত ২১ জুন রোববার দেশের শীর্ষ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে সরকারের দুই মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাঁচ সংস্থার চেয়ারম্যানরা তাদের কারখানাগুলোর চিত্র তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) এবং বাংলাদেশ ইস্পাত শিল্প করপোরেশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) এবং বাংলাদেশ বস্ত্রকল করপোরেশন (বিটিএমসি)। এসব বৈঠক এই বার্তাই দিয়েছে যে, সরকার বিষয়টিকে কেবল প্রশাসনিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না; বরং বাস্তব বিনিয়োগ ও উৎপাদনে রূপান্তর দেখতে চায়।

বাংলাদেশে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সংখ্যা কত, সে বিষয়ে হালনাগাদ সরকারি তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে ২০২৪ সালের জুন মাসে জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্যমতে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৯৭টি। এর মধ্যে বিসিকের অধীনে ৩৮২টি রুগ্ন বা বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিসিআইসির অধীনে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান, বিএসএফআইসির অধীনে ছয়টি চিনিকল এবং বিএসইসির অধীনে চারটি কারখানা ছিল। গত দুই বছরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু উৎপাদন বন্ধ হয় না, বন্ধ হয়ে যায় বহু মানুষের জীবিকার পথ। একজন শ্রমিক চাকরি হারালে তার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় দোকানদার, পরিবহন শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক চক্র গড়ে ওঠে, তা ভেঙে পড়লে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে যায়। ফলে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রশ্নটি কেবল শিল্পনীতির নয়; এটি কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতারও প্রশ্ন।

বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে অবদান রেখেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের অভাব, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, বাজার বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্য এবং উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়ে। একপর্যায়ে সেগুলোর কিছু সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, আবার কিছু নামমাত্র কার্যক্রম চালিয়ে টিকে থাকে।

এই বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের উদ্যোগকে অবশ্যই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক বলা যায়। কারণ এখানে শুধু কারখানা পুনরায় চালুর কথা বলা হচ্ছে না; বরং অচল সম্পদকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের চিন্তা করা হচ্ছে। বহু বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে মূল্যবান জমি, স্থাপনা, বিদ্যুৎ সংযোগ, গ্যাস সুবিধা, সড়ক যোগাযোগ এবং অন্যান্য অবকাঠামো। নতুন করে শিল্প স্থাপন করতে যেখানে বিপুল বিনিয়োগ ও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়, সেখানে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এমন উদাহরণ রয়েছে। অনেক রাষ্ট্র অচল শিল্পাঞ্চলকে পুনর্গঠন করে আধুনিক শিল্পপার্ক, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তর করেছে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে এবং স্থানীয় অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর যে গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটিও অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বিনিয়োগকারীরা এমন জায়গা খোঁজেন, যেখানে অবকাঠামো প্রস্তুত, নীতিগত স্থিতিশীলতা রয়েছে এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ অনুকূল। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জমি ও অবকাঠামো যদি সুশৃঙ্খলভাবে বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা যায়, তাহলে তা দেশের শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশ এখন এলডিসি উত্তরণের পথে। এই উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। ফলে অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করতে হবে। তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, রাসায়নিক শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক উৎপাদন খাতের বিকাশ প্রয়োজন। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি অংশকে নতুন প্রজন্মের শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট-সরকার অচল সম্পদকে সচল অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার পথ খুঁজছে। এই প্রচেষ্টা যদি ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আজকের বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোই আগামী দিনের শিল্পায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বহুদিন ধরে নীরব হয়ে থাকা কারখানাগুলোর চিমনিতে আবার ধোঁয়া উঠতে পারে, উৎপাদন লাইনে ফিরতে পারে কর্মচাঞ্চল্য, আর অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারে নতুন গতি। বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য এর চেয়ে আশাব্যঞ্জক সংবাদ আর কী হতে পারে?

তবে উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। প্রথমত, কোন কারখানা পুনরায় চালু করা সম্ভব এবং কোনগুলো বিকল্প ব্যবহারের জন্য উপযোগী, তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক ও কর্মচারীদের স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হবে। চতুর্থত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও জটিলতামুক্ত করতে হবে। অন্যথায় ভালো উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা। বিনিয়োগকারীরা তখনই এগিয়ে আসবেন, যখন তারা বিশ্বাস করবেন যে, সরকারের নীতি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সম্পৃক্ততা ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কারণ এটি বিনিয়োগকারীদের কাছে সরকারের অগ্রাধিকার ও আন্তরিকতার স্পষ্ট সংকেত দেয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে, তার মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি অন্যতম। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা গেলে এই লক্ষ্য অর্জনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে আটকে থাকা অনেক বিনিয়োগও নতুন গতি পেতে পারে।

অর্থনীতির ভাষায় সম্পদ তখনই সম্পদ, যখন তা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হয়। বছরের পর বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা জমি, ভবন ও শিল্প অবকাঠামো কোনো দেশের জন্য গৌরবের বিষয় হতে পারে না। বরং এগুলোকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগের উৎসে পরিণত করাই উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই বিবেচনায় বন্ধ, রুগ্ন ও অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী।

এখন প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, দক্ষতা এবং দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন। কারণ বহুদিন ধরে নীরব হয়ে থাকা কারখানার চিমনিতে আবার ধোঁয়া উঠলে শুধু উৎপাদনই বাড়বে না; বাড়বে মানুষের আস্থা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতির গতিশীলতাও। বাংলাদেশের শিল্প খাতের জন্য এটি হতে পারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আর সেই অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে একটি মৌলিক দর্শন- অচল সম্পদ নয়, উৎপাদনশীল বাংলাদেশ।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!