× UCB Sticker Card
সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মো. শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’, ২৩১ বছরের গৌরবগাঁথা : ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিক অভিযাত্রা

মো. শরীফুল ইসলাম

প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

মো. শরীফুল ইসলাম।

মো. শরীফুল ইসলাম।

শহুরে জনপদ থেকে দূরে, বহু দূরে- দুর্গম পাহাড়, গহীন অরণ্য, উত্তাল নদী, চরাঞ্চল কিংবা উপকূলের লবণাক্ত জনপদ; যেখানে প্রতিকূল প্রকৃতি প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দেয়, যেখানে সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি রক্ষায় প্রয়োজন অদম্য সাহস, ধৈর্য ও দেশপ্রেম- সেখানেই নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছে ২৩১ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে গৌরবান্বিত উপমহাদেশের প্রাচীনতম সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে পরিচিত এই বাহিনী শুধু সীমান্ত পাহারার দায়িত্বই পালন করে না; বরং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং জাতীয় সংকটে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।

গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের অমর সাক্ষী

বিজিবির ইতিহাস শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র উপমহাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজ থেকে ২৩১ বছর আগে, ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন পার্বত্য খাগড়াছড়ির রামগড়ে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ নামে এই বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে এই বাহিনী গঠন করলেও সময়ের প্রবাহে এটি ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত ও দক্ষ সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে পরিণত হয়। সুদীর্ঘ অভিযাত্রায় বাহিনীটির নাম ও কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে একাধিকবার। ফ্রন্টিয়ার গার্ডস, বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ, ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) হয়ে আজকের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-প্রতিটি পর্যায়ই বাহিনীটির সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্বের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাহিনীটি কেবল সীমান্ত পাহারায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে সংঘটিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে এই বাহিনীর সদস্যরা অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। লুসাই বিদ্রোহ দমন, সিকিম ও চাইনিজ আম্বান অভিযান এবং আসালং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তারা তাদের পেশাগত দক্ষতা ও সাহসিকতার স্বাক্ষর রাখেন। পরবর্তীকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের অসাধারণ সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ সরকার বাহিনীর সদস্যদের ভাইসররয়’স কমেন্ডেশন, ইন্ডিয়ান অর্ডার অব মেরিট, নিশান-ই-হায়দার এবং তৎকালীন বিভিন্ন সামরিক সম্মাননায় ভূষিত করে। এই অর্জনগুলো শুধু বাহিনীর নয়, সমগ্র উপমহাদেশের সামরিক ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল সম্পদ।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাহিনীর অবিস্মরণীয় অবদান

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এর অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তরে বেলুচ রেজিমেন্টের কঠোর নজরদারি উপেক্ষা করে একদল দেশপ্রেমিক জওয়ান স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। সেই পতাকাই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিটি ইপিআর ক্যাম্পে ছড়িয়ে দেয়। পরবর্তীকালে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা বাহিনীগুলোর অন্যতম ছিল ইপিআর। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে তারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং সম্মুখসমরে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অসাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এই বাহিনীর ৮১৭ জন সদস্য শহীদ হন। স্বাধীনতার জন্য তাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই বাহিনীর ২ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৮ জন বীরউত্তম, ৩২ জন বীরবিক্রম এবং ৭৮ জন বীরপ্রতীকসহ মোট ১১৯টি রাষ্ট্রীয় বীরত্বসূচক খেতাব অর্জন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক বীরত্বসূচক খেতাব অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইপিআর অন্যতম।

মহান মুক্তিযুদ্ধ বিজিবির ইতিহাসে শুধু একটি গৌরবের অধ্যায় নয়; এটি বাহিনীর আদর্শ, চেতনা ও দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ প্রকাশ। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষার যে অঙ্গীকার ১৯৭১ সালে ইপিআরের সদস্যরা রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই অঙ্গীকার আজও সমান দৃঢ়তার সঙ্গে ধারণ করে চলেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সীমান্ত রক্ষায় বীরত্বের নতুন অধ্যায়

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সুদীর্ঘ ৪,৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত অখণ্ডতা ও সীমান্ত নিরাপত্তার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করে বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সীমান্ত পুনর্গঠন, আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং চোরাচালান ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে বাহিনীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং সীমান্তে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাহিনীর সদস্যরা অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাহিনীর দেড় শতাধিক সদস্য শহীদ হন।

স্বাধীন বাংলাদেশের সীমান্ত ইতিহাসে কয়েকটি ঘটনা বিজিবির বীরত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কুড়িগ্রামের বড়াইবাড়ী সীমান্তে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবির সদস্যরা যে সাহসিকতা প্রদর্শন করেন, তা জাতীয় ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হীরাপুর, সিলেটের পাদুয়া এবং কক্সবাজারের নাফ সীমান্তে সংঘটিত বিভিন্ন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিজিবি দৃঢ়তা, পেশাদারিত্ব এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশের সীমান্ত অক্ষুণ্ণ রেখেছে। প্রতিটি ঘটনায় বিজিবির সদস্যরা প্রমাণ করেছেন যে দেশের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডের নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা কখনো আপস করেন না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিজিবির অনবদ্য ভূমিকা

পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিজিবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দুর্গম পাহাড়, ঘন অরণ্য ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে বাহিনীটি। শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, চিকিৎসা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বিজিবি মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমন ও পুশ-ইন প্রতিরোধে বিজিবির জোরালো ভূমিকা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সীমান্তে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতায় সীমান্তে উত্তেজনা, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেও বিজিবি অসাধারণ ধৈর্য, সংযম, পেশাদারিত্ব ও বিচক্ষণতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দেশবাসীর আস্থা ও অকুণ্ঠ সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং ভারত থেকে অবৈধভাবে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশ-ইনের অপচেষ্টা নতুন করে সীমান্ত পরিস্থিতিকে সংবেদনশীল করে তোলে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি দায়িত্বশীল, আইনসম্মত ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নীতি, বিদ্যমান আইন ও দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বিজিবি দেশপ্রেমিক জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিটি পুশইনের ঘটনা অত্যন্ত সফলভাবে রুখে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। শুধু সীমান্তে টহল ও নজরদারিই নয়, সীমান্তবর্তী জনগণকে সম্পৃক্ত করে গুজব প্রতিরোধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং যেকোনো উসকানিমূলক পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও বিজিবি কার্যকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সীমান্তবাসীর সহযোগিতা ও আস্থাকে শক্তিতে পরিণত করে বাহিনীটি সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সর্বদা অবিচল, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত রয়েছে। পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম এবং আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বিজিবি জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে সর্বদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

সীমান্ত নিরাপত্তায় আধুনিকায়নের নতুন দিগন্ত

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ একটি প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ত্রিমাত্রিক সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রচলিত টহল ও নজরদারির পাশাপাশি বর্তমানে ড্রোন, উন্নত সার্ভেইলেন্স সিস্টেম, নিজস্ব উদ্যোগে স্থাপিত রাডার এবং আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দুর্গম সীমান্তবর্তী বিওপিগুলোতে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সংযুক্ত হওয়ায় দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা আরও কার্যকর হয়েছে।

চোরাচালান দমন, মাদক ও  অস্ত্রের অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ এবং মানবপাচারসহ অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে বিজিবির সাফল্য

জাতীয় অর্থনীতি, জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য চোরাচালান, মাদক, অস্ত্র এবং মানবপাচার বড় ধরনের হুমকি। এসব অপরাধ দমনে বিজিবি দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত অভিযান এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় বাহিনীটি বিপুল পরিমাণ মাদক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, স্বর্ণ, বৈদেশিক পণ্য ও অন্যান্য চোরাচালানি মালামাল জব্দ করছে।

বিশেষ করে তরুণ সমাজকে মাদকের অভিশাপ থেকে রক্ষায় বিজিবি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে সীমান্তজুড়ে কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচার প্রতিরোধ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মিয়ানমার সীমান্তে সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সীমান্তের ওপারে সশস্ত্র সংঘাত, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং মানবিক সংকটের মধ্যেও বিজিবি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সীমান্তের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বাংলাদেশের ভূখণ্ড কোনো পক্ষের ব্যবহার করতে না দেওয়া, সীমান্তে অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে মোকাবিলায় বাহিনীটি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের পরিচয় দিচ্ছে। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার, অপহৃত জেলেদের ফিরিয়ে আনা এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বিজিবি মানবিক ভূমিকা পালন করেছে।

সীমান্ত মানুষের পাশে মানবিক বিজিবি

বিজিবি শুধু অস্ত্র হাতে সীমান্ত পাহারা দেয় না; সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুর্গম পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা সহায়তা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি পরিচালনার মাধ্যমে বাহিনীটি সীমান্তবাসীর আস্থা অর্জন করেছে।

পার্বত্য অঞ্চলে বিজিবি পরিচালিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বহু তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে চোরাচালানে জড়িত অনেক মানুষকে বিকল্প জীবিকার পথে ফিরিয়ে আনতে বিজিবির পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতেও বিজিবি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন দুর্যোগেও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় করেছে।

সীমান্তের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ শুধু একটি সীমান্তরক্ষী বাহিনী নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং জাতীয় গৌরবের এক অনন্য প্রতীক। দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসে বিজিবি বহু নাম ধারণ করেছে, বহু চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছে, কিন্তু একটি বিষয় কখনো পরিবর্তিত হয়নি- দেশের প্রতি অবিচল আনুগত্য।

সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি, প্রতিটি সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বিজিবির সদস্যরা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও একই নিষ্ঠা, সাহস ও দেশপ্রেম নিয়ে দায়িত্ব পালন করবে-এটাই জাতির প্রত্যাশা।

উপসংহার

‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ থেকে শুরু করে কালের পরিক্রমায় লুসাই বিদ্রোহ, আসালং যুদ্ধ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী সীমান্ত সংঘাত, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাহিনীটি অসামান্য দক্ষতা, সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। ২৩১ বছরের এই গৌরবোজ্জ্বল অভিযাত্রা প্রমাণ করে, সীমান্তের প্রতিটি প্রহরে, প্রতিটি চ্যালেঞ্জে এবং প্রতিটি সংকটে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে—দেশের ‘সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে।

জনসংযোগ কর্মকর্তা, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ

Link copied!