বিশ্ব ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন রাষ্ট্রগুলোর সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায় তারা কি কেবল পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে, নাকি নিজেরাই নতুন বাস্তবতা নির্মাণ করবে? আজ বাংলাদেশ ঠিক এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
বিশ্বায়নের এ সন্ধিক্ষণে আগামী যুগের প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নয়। আগামী যুগ হবে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি, সমুদ্র, সরবরাহ শৃঙ্খল, উদ্ভাবন এবং ভূরাজনৈতিক সক্ষমতার যুগ।
একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে অর্থনৈতিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই শক্তিকে রক্ষা করার সক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপকে নতুন করে নিরাপত্তার প্রশ্নে ভাবতে বাধ্য করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দেখিয়েছে যে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা কত দ্রুত অনিশ্চয়তায় পরিণত হতে পারে। লোহিত সাগরের অস্থিরতা বৈশ্বিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করেছে। কোভিড-১৯ বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে একটি ভাইরাসও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে দিতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা আবারও প্রমাণ করেছে যে আগামী দিনের ক্ষমতা শুধু অস্ত্রের নয়; জ্ঞান, প্রযুক্তি ও তথ্যেরও।
বিশ্বরাজনীতির ইতিহাস মূলত শক্তির কেন্দ্র পরিবর্তনের ইতিহাস
একসময় আটলান্টিক মহাসাগর ছিল বৈশ্বিক শক্তির প্রধান কেন্দ্র। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোর উত্থান, শিল্পবিপ্লব, আন্তঃমহাদেশীয় বাণিজ্য এবং পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব সবকিছু মিলিয়ে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর একটি বড় অংশকে অনেক বিশ্লেষক ‘আটলান্টিক সেঞ্চুরি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
পরবর্তীকালে বিশ্বের অর্থনৈতিক ও শিল্পগত শক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে সরে যেতে থাকে। জাপানের অর্থনৈতিক বিস্ময়, দক্ষিণ কোরিয়ার উত্থান, চীনের দ্রুত প্রবৃদ্ধি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পায়ন নতুন এক বাস্তবতার জন্ম দেয়। তখন অনেকেই ‘প্যাসিফিক সেঞ্চুরি’-এর কথা বলতে শুরু করেন।
কিন্তু আজ পৃথিবী আরও এক নতুন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে
আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ক্রমশ বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্রপথ, বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর একটি বড় অংশ, জ্বালানি পরিবহনের প্রধান করিডর, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার একটি বড় অংশ এই অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।
ফলে একবিংশ শতাব্দীর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কে ইন্দো-প্যাসিফিকের নতুন বাস্তবতাকে সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে এবং কাজে লাগাতে পারবে?
এই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্র থেকে খুব দূরে নয় বাংলাদেশ। বরং বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থানকারী বাংলাদেশ এমন এক ভৌগোলিক বাস্তবতার অংশ, যার গুরুত্ব আগামী কয়েক দশকে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অনেকেই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ কেবল দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক বিশ্বের একটি স্বাভাবিক সংযোগবিন্দু।
পশ্চিমে ভারত, পূর্বে মিয়ানমার, উত্তরে হিমালয়-সংলগ্ন ভূরাজনীতি, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, আর বিস্তৃত পরিসরে চীন, ASEAN, মালাক্কা প্রণালী, আন্দামান সাগর এবং পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক বলয় সবকিছুর সংযোগস্থলে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।
বিশ্বের বহু রাষ্ট্রের কাছে এমন ভূ-কৌশলগত অবস্থান একটি স্বপ্ন
কিন্তু ভূগোল কখনও আশীর্বাদ, কখনও দায়িত্ব। এই ভূগোলকে কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করা না গেলে তার পূর্ণ সম্ভাবনা কখনও বাস্তবায়িত হয় না।
ব্রিটিশ ভূরাজনীতিবিদ হ্যালফোর্ড ম্যাকিন্ডার বলেছিলেন, ম্যান এন্ড নোট্ নেচার ইনিটিএতেস, বুট নেচার ইন লার্জ মেজার কন্ট্রোলস. অর্থাৎ মানুষ পরিকল্পনা করে, কিন্তু ভূগোল সেই পরিকল্পনার সীমা ও সম্ভাবনা নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের নতুন গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজির সূচনা হওয়া উচিত এই উপলব্ধি থেকে যে আমাদের ভবিষ্যৎ শুধু স্থলভাগে নয়; সমুদ্রেও নির্ধারিত হবে।
বঙ্গোপসাগর: বাংলাদেশের কৌশলগত হৃদয়
বিশ্ব বাণিজ্যের অধিকাংশই সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। মালাক্কা প্রণালী, দক্ষিণ চীন সাগর, আন্দামান সাগর এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরেই ভবিষ্যতের বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির একটি বড় অংশ আবর্তিত হবে।
মালাক্কা প্রণালী দিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য প্রবাহ চলাচল করে। পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে সংযুক্তকারী এই করিডরের পশ্চিম প্রবেশপথের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, কোয়াড, AUKUS এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা এই অঞ্চলের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে।
বাংলাদেশের জন্য তাই বঙ্গোপসাগর কেবল একটি জলরাশি নয়; এটি অর্থনীতি, জ্বালানি, সামুদ্রিক সম্পদ, সাবমেরিন কেবল, ব্লু ইকোনমি, বন্দর উন্নয়ন এবং কৌশলগত প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দু। যে রাষ্ট্র তার সমুদ্রকে বোঝে না, সে তার ভবিষ্যতের একটি অংশ হারিয়ে ফেলে।
সীমান্ত থেকে স্মার্ট বর্ডার
বাংলাদেশের সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম জটিল সীমান্ত ব্যবস্থার একটি। একবিংশ শতাব্দীতে সীমান্ত নিরাপত্তা কেবল কাঁটাতার বা চৌকির মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতের সীমান্ত হবে সেন্সর, ড্রোন, স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োমেট্রিক ডেটা এবং রিয়েল-টাইম তথ্য বিশ্লেষণের সীমান্ত।
অবৈধ অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং অনিয়ন্ত্রিত চলাচল মোকাবিলায় বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ‘স্মার্ট বর্ডার ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট: মানবিক চ্যালেঞ্জ থেকে কৌশলগত বাস্তবতা
রোহিঙ্গা সংকট কেবল মানবিক সমস্যা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের ইতিহাস বলে, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি ও শরণার্থী সংকট প্রায়ই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। ফলে এই ইস্যুকে কেবল মানবিক নয়, কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করতে হবে।
নিরাপত্তার নতুন সীমানা: সাইবার, এআই ও প্রযুক্তি
ভবিষ্যতের অনেক সংঘাত যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং ডেটা সেন্টার, আর্থিক নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, স্যাটেলাইট ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্প আগামী শতাব্দীর জাতীয় শক্তির অন্যতম ভিত্তি। আজ যে রাষ্ট্র প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে, আগামীকাল সেই রাষ্ট্রই প্রভাব বিস্তার করবে। বাংলাদেশকে তাই শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সক্ষম রাষ্ট্র হওয়ার লক্ষ্য স্থির করতে হবে।
গ্লোবাল সাউথে বাংলাদেশের সম্ভাব্য নেতৃত্ব
বিশ্ব ধীরে ধীরে একমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতা থেকে বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের গুরুত্বও বাড়ছে। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা অবদান, জলবায়ু কূটনীতি, মানবিক সহায়তা এবং উন্নয়ন অভিজ্ঞতা তাকে একটি স্বতন্ত্র গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। যদি অর্থনৈতিক অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সামুদ্রিক শক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাকে একত্রিত করা যায়, তবে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে গ্লোবাল সাউথের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত হতে পারে।
একটি নতুন রাষ্ট্রদর্শনের আহ্বান
সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা লি কুয়ান ইউ একবার বলেছিলেন, টি সাইজও অফ আ কান্ট্রি ইস ইররেলেভান্ট. টি কোয়ালিটি অফ ইটস লিডারশিপ এন্ড ইনস্টিটিউশন্স ইস হোয়াট ম্যাটার্স। অর্থাৎ দেশের আকার কোনো বিষয় না, এর নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মানই আসল বিষয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে তার প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব, মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার মাধ্যমে। আমাদের লক্ষ্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং এমন একটি আত্মবিশ্বাসী, প্রযুক্তিনির্ভর, সামুদ্রিকভাবে সচেতন, অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীল এবং কৌশলগতভাবে পরিণত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া, যে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করতে পারে।
কারণ একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীতে সম্মান পাবে সেই রাষ্ট্র, যে অন্যের শক্তির ছায়ায় নয়, নিজের সক্ষমতার ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারে; যে ভূগোলকে ভাগ্য হিসেবে মেনে নেয় না, বরং তাকে শক্তিতে রূপান্তর করে; এবং যে বুঝতে পারে নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়, বরং জাতীয় পুনর্জাগরণের ভিত্তি। বঙ্গোপসাগরের তীর থেকে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরা এর দৃশ্যমান ও সুসংহত সাফল্য দেখতে চাই।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন