দীর্ঘদিন মাঠে থেকে রাজনীতি করেও মনোনয়ন না পাওয়ায় রাজশাহীর চারটি সংসদীয় আসনের বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। আসন্ন নির্বাচনে তারা মাঠ ছাড়তে নারাজ। মনোনয়ন ফরম তুলছেন এবং নির্বাচনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন। দলীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা গণসংযোগসহ প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেকেই প্রার্থী হতে মনোনয়ন ফরম তুলেছেন।
রাজশাহীর মোট ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে একমাত্র রাজশাহী-২ (মহানগর) আসন ছাড়া বাকি পাঁচটিতেই বিএনপির দলীয় প্রার্থীদের বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। মনোনয়নবঞ্চিতদের দাবি, দলীয় নেতাকর্মীরা তাদের পাশেই থাকবেন। নেতাকর্মীদের চাপেই তারা মনোনয়ন ফরম তুলেছেন।
জানা গেছে, রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দিন। তিনি সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ভাই। এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সদস্য ও বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা সুলতানুল ইসলাম তারেক। গত ১৮ ডিসেম্বর তারেকের পক্ষে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেন।
মনোনয়নপত্র উত্তোলনের পর তারেকের পক্ষে উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের একাংশ মাঠে প্রচার অব্যাহত রেখেছেন। তাদের দাবি, রাজশাহী-১ আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত তারেকই মনোনয়ন পাবেন। গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনারুল ইসলামসহ দুই উপজেলার বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী তারেকের মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেন।
আনারুল ইসলাম বলেন, দুই উপজেলার বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সিংহভাগ নেতাকর্মী তারেকের সঙ্গে রয়েছেন। মনোনয়ন পরিবর্তন না হলে দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি ঘটবে। ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন তারা। আপাতত নেতাকর্মীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারেক ভোটের মাঠে থাকবেন।
রাজশাহী-৬ (চারঘাট-পুঠিয়া) আসনে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও ৩ নভেম্বর দলীয় মনোনয়ন পান জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ। এ আসনে আরও সাত জন বিএনপি নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
মনোনয়ন ঘোষণার পর অনেকেই সরে গেলেও আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল গণসংযোগ ও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ১৮ ডিসেম্বর উজ্জ্বলের পক্ষে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেন চারঘাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুরাদ পাশাসহ দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশ।
মুরাদ পাশা বলেন, দুই উপজেলার বড় একটি অংশের নেতাকর্মী উজ্জ্বলকে প্রার্থী দেখতে চান। ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষদিনের আগে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। আপাতত মনোনয়নপত্র উত্তোলন করা হয়েছে, পরে দলীয় নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে রেকর্ডসংখ্যক ১২ জন নেতা বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত জেলা বিএনপির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডলকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ৩ নভেম্বর মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছেন বঞ্চিত প্রার্থীদের অনুসারীরা।
২০ নভেম্বর এই আসনে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেন জুলকার নাঈম মোস্তফা বিস্ময়। তিনি রাজশাহী-৫ আসনের দুবারের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত নাদিম মোস্তফার ছেলে। দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আকবর আলী বাবলুসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী তার পক্ষে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেন।
চলতি সপ্তাহে এই আসনের অপর দুই মনোনয়নপ্রত্যাশী, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু বকর সিদ্দিক এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফাও মনোনয়নপত্র উত্তোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গোলাম মোস্তফা জানান, তিনি মনোনয়নপত্র তুলবেন।
এ প্রসঙ্গে দুর্গাপুর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইমন আহমেদ সুমন বলেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তরুণদের নেতৃত্বে এগিয়ে আনার কথা বলেছেন। সেই বিবেচনায় নজরুল ইসলাম মণ্ডল একজন বয়োজ্যেষ্ঠ প্রার্থী। আমরা তরুণদের মনোনয়নের দাবি জানিয়ে আসছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নাদিম মোস্তফার ছেলে জুলকার নাঈম মোস্তফা বিস্ময় বয়সে তরুণ, ক্লিন ইমেজের এবং জনপ্রিয় প্রার্থী। নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাকে এমপি হিসেবে দেখতে চান।’
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে মনোনয়নবঞ্চিত যুবদল নেতা রেজাউল ইসলাম টুটুলের পক্ষেও মনোনয়ন ফরম তোলা হয়েছে। এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডিএম জিয়াউর রহমান।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, ‘দল ত্যাগী ও যোগ্যদেরই মনোনয়ন দিয়েছে। যারা দলের সিদ্ধান্ত মানছেন না, তাদের বোঝানোর চেষ্টা চলছে। আশা করি দলের বৃহত্তর স্বার্থে তারা সরে এসে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।’
তিনি আরও বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরলে সবাইকে নিয়ে বসে সমস্যার সমাধান করা হবে। বিএনপি একটি বড় দল, নেতাকর্মীদের চাওয়া-পাওয়া থাকবেই। সবাইকে নিয়েই দল এগিয়ে যাবে।




