রাজশাহীর বাগমারায় চুরির অভিযোগে শতাধিক মানুষের সামনে প্রকাশ্যে ওমর ফারুক (৩৮) নামের এক ভ্যানচালককে নির্মমভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। গত ১৭ ডিসেম্বর বুধবার সন্ধ্যায় বাগমারা উপজেলা সদরের সিএনজি সমিতির নেতৃত্বে সমিতির সদস্যরা ফারুককে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী প্রকাশ্যে উলঙ্গ করে নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মারধরের শিকার হয়ে ওমর ফারুকের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাত দিনের সাজা দিয়ে তাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠান। সেখানে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
শনিবার (২০ ডিসেম্বর) পর্যন্ত কারা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ফারুক। অবশেষে রোববার ভোরে তার মৃত্যু হয়।
নিহত ফারুক ভবানীগঞ্জ পৌরসভার চানপাড়া মহল্লার মসলেম সরদারের ছেলে। এই পাশবিক নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনায় ফারুকের পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার এ ঘটনায় মামলা দায়ের করবে বলে জানিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ওমর ফারুককে চুরির অপবাদে বুধবার সন্ধ্যায় সিএনজি সমিতির সদস্যরা আটক করে মারধর শুরু করেন। সিএনজি সমিতির ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য সংঘবদ্ধ হয়ে তাকে লোহার রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করেন। দেয়ালের প্রাচীরের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে তার দুই হাত ও দুই পায়ে প্রায় দুই ইঞ্চি লোহার পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পানি খাওয়ার আকুতি জানালেও ফারুকের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়। পার্শ্ববর্তী বারনই নদীতে কয়েক দফা চুবিয়ে আবারও বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হয়।
ঘটনাস্থল ভবানীগঞ্জ পৌরসভা সদরের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে ভ্যানচালক ওমর ফারুক বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় তিনি সিএনজি স্ট্যান্ডের সামনে ভ্যান রেখে প্রসাব করতে যান। পরে ভ্যানের কাছে ফিরে এলে চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে আটক করেন সিএনজি সমিতির সভাপতি রেজাউল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন।
এরপর সভাপতি রেজাউল ও সম্পাদক মতিনসহ সমিতির সদস্য হান্নান, বিপ্লব, মোজাম্মেলসহ ১০ থেকে ১৫ জন ফারুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মব তৈরি করেন। তাকে লোহার রড দিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ফারুক মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে পাশের একটি প্রাচীরের সঙ্গে দাঁড় করানো হয়।
সমিতির কয়েকজন সদস্য তাকে শক্ত করে ধরে রাখেন। এরপর তার দুই হাত ও দুই পায়ে হাতুড়ি দিয়ে ৮ থেকে ১০টি দুই ইঞ্চি লোহার পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় ফারুক পানি, পানি বলে চিৎকার করতে থাকেন এবং বারবার পানি খাওয়ার আকুতি জানান। চিৎকার ও মারধরের ঘটনা দেখে সেখানে যান ফারুকের চাচা আনিসুর রহমান।
এরপর নির্যাতনকারীরা তাকে সিএনজি স্ট্যান্ডের কাছে রানী নদীতে নিয়ে গিয়ে উলঙ্গ করে পানিতে চুবাতে থাকেন। পরে আবার সিএনজি স্ট্যান্ডে এনে নির্যাতন চালানো হয়। ফারুক পানি চাইলে কয়েক দফা তাকে নদীর পানিতে চুবানো হয়। এমনকি তার পায়ুপথে ঝাল মরিচের গুঁড়া ঢুকিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
একপর্যায়ে ফারুকের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে সিএনজি সমিতির সভাপতি রেজাউল বাগমারা থানা পুলিশকে খবর দেন। পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ফারুকের শারীরিক অবস্থা দেখে তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে বাগমারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ভূঞা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ভূঞা বলেন, ফারুকের কাছ থেকে এক পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে সাত দিনের কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে তাকে মারধর করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন। পরে তার অসুস্থতার কথা শুনে চিকিৎসার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন বলে জানান।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা দেওয়ার পর পুলিশি গাড়িতে নয়, সিএনজি সমিতির একটি সিএনজিতে পুলিশের পাহারায় আহত অবস্থায় ফারুককে প্রথমে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ১৭ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে তাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহ আলম খান বলেন, আহত অবস্থায় ওমর ফারুককে কারাগারে গ্রহণ করা হয়। তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর ছিল। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সনদে তার আহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। এ কারণে ১৮ ডিসেম্বর সকালে তাকে রামেক হাসপাতালের ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ২০ ডিসেম্বর ভোর পাঁচটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নিহত ফারুকের বাবা মসলেম সরদার বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে তারা সিএনজি স্ট্যান্ডে গিয়ে ছেলেকে পাননি। পরে জানতে পারেন, তাকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর সিএনজি সমিতির সভাপতি রেজাউল ফোন করে ছেলের অসুস্থতার কথা জানান। তিনি হাসপাতালে গিয়ে ছেলেকে খুঁজে পাননি। আর্থিক সংকটের কারণে রাজশাহীতে যেতে পারেননি। ২০ ডিসেম্বর ভোরে সিএনজি চালক সোহেল ফোন করে তার মৃত্যুর খবর দেন।
ফারুকের মা পারুল বেগম বলেন, আমার দুটি সন্তান। ফারুক বড়। তার ১৩ বছর বয়সী এক ছেলে আছে। আমার ছেলেকে উলঙ্গ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। পানি পর্যন্ত খেতে দেওয়া হয়নি। আমরা অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ। আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করব।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন