রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার পাহাড়ি জনপদে নীরবে গড়ে উঠেছে এক সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক বিপ্লব। পাহাড়ের ঢালে-ঢালে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ফুল ঝাড়ু স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘উলফুল’—আজ হয়ে উঠেছে বহু পরিবারের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। শীত মৌসুম এলেই পাহাড়ি বন-জঙ্গলে সাদা-রূপালি ঝাড়ু ফুলের সমারোহ দেখা যায়। আর সেই ফুল ঘিরেই জমে ওঠে সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের ব্যস্ততা।
জানা যায়, বাসা-বাড়ি, আঙিনা ও প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে এই ঝাড়ু ফুলের কদর বরাবরই বেশি। আধুনিক পরিষ্কার সামগ্রীর ভিড়েও উলফুলের ঝাড়ুর চাহিদা কমেনি। বরং গ্রাম থেকে শহর, নিম্নবিত্ত থেকে বিত্তবান—সব শ্রেণির মানুষের ঘরেই জায়গা করে নিয়েছে এই প্রাকৃতিক ঝাড়ু। টেকসই, হালকা ও কার্যকর হওয়ায় এটি এখনো অপরিহার্য গৃহস্থালি সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত।
পাহাড় থেকে হাট-বাজার, সেখান থেকে রাজধানী
রাজস্থলীর বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা, বিশেষ করে এই পাহাড় এলাকা দুর্গম অঞ্চল থেকে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ঝাড়ু ফুল সংগ্রহ করেন। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সংগ্রহ করা এই ফুল স্থানীয় হাট-বাজারে এনে আঁটি বেঁধে বিক্রি করা হয়। সেখান থেকে পাইকারীরা তা কিনে নিয়ে যান চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
জানা যায়, ২০ থেকে ৩০টি শলাকা দিয়ে একটি ঝাড়ুর আঁটি তৈরি করা হয়। প্রতিটি আঁটি মান ও আকারভেদে ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হয়। এক একটি বান্ডিলে থাকে ৫০ থেকে ১০০টি আঁটি, যার বাজারমূল্য এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত। মানভেদে দাম কমবেশি হয়।
রাজস্থলী ও বাঙ্গালহালিয়া সাপ্তাহিক হাট বাজারের এসব ঝাড়ু ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। স্থানীয় স্বল্প আয়ের নারী-পুরুষরা বন থেকে সংগ্রহ করা ফুল শুকিয়ে, ছেঁটে ও বেঁধে বাজারজাত করেন। অনেক পরিবার সপ্তাহে ৫০টির বেশি আঁটি বিক্রি করে অতিরিক্ত এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
জুমচাষের ফাঁকে বাড়তি আয়
পাহাড়ি জুমিয়া পরিবারের নারীরাও জুমচাষ শেষে বাড়ি ফেরার পথে ঝাড়ু ফুল সংগ্রহ করেন। সংসারের বাড়তি আয় নিশ্চিত করতে তারা এখন নিয়মিতভাবে এ কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এক নারী সংগ্রাহক জানান, জুমের কাজ শেষে পাহাড় থেকে উলফুল কেটে আনি। সপ্তাহে একদিন বাজারে বিক্রি করি। এতে সংসারের খরচে কিছুটা স্বস্তি পাই।
এক কৃষক বলেন, ‘প্রতি রাজস্থলী বুধবার ও বাঙ্গালহালিয়া মঙ্গলবার বাজারে ঝাড়ুর আঁটি বিক্রি করি। ২০টি শলাকা দিয়ে একটি আঁটি বানাই। সপ্তাহে প্রায় ৫০টি আঁটি বিক্রি করে এক হাজার টাকার মতো আয় হয়। এটি আমাদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাড়তি আয়।’
ব্যবসায়ীদের উদ্যোগ ও সম্ভাবনার দিগন্ত
উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত ব্যবসায়ীরা স্থানীয়দের কাছ থেকে পাইকারি দামে ঝাড়ু ফুল কিনে রোদে শুকিয়ে উন্নত মানের ঝাড়ু তৈরি করছেন। এরপর ট্রাকযোগে চট্টগ্রাম-ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন একজন শ্রমজীবী ব্যক্তি পাহাড় থেকে এক থেকে দেড় হাজার টাকার শলাকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
এক ব্যবসায়ী জানান, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের স্বল্প আয়ের মানুষদের কাছ থেকে ঝাড়ু ফুল কিনে ঢাকায় সরবরাহ করছি। যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণ পাওয়া যায়, তাহলে এটি একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হতে পারে।
রপ্তানির সম্ভাবনা ও টেকসই উদ্যোগের দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ঝাড়ু ফুল ইতোমধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এর চাষ ও সংরক্ষণ করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ সুবিধা, সংরক্ষণাগার ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা পেলে ঝাড়ু ফুলকে ঘিরে একটি টেকসই শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। এতে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি পাহাড়ি অঞ্চলের অর্থনীতিও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াবে।
উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহারই পারে একটি অঞ্চলের অর্থনীতিকে বদলে দিতে। রাজস্থলীর পাহাড়ে জন্মানো ঝাড়ু ফুল আজ সেই সম্ভাবনার উজ্জ্বল উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ‘উলফুল’ শুধু পাহাড় নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

