ষড়ঋতুর রঙ্গমঞ্চে বসন্ত এখনো ক্যালেন্ডারের পাতায় আসেনি, কিন্তু ফাগুনের মোহনায় সাতক্ষীরার প্রকৃতিতে তার আগাম বার্তা জেলার দিক-দিগন্তে আমের মুকুলের ম-ম গন্ধে মুখরিত হয়ে উঠেছে।
এ বছর জেলায় ৪ হাজার ১১৮ হেক্টর জমিতে আমবাগানের চাষ হয়েছে। আম্রকাননের এই সুবাস কেবল ঘ্রাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং উপকূলীয় জেলা ও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করছেন জেলার আম চাষিরা।
শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই আমগাছগুলো সেজেছে হলুদ-সোনালি রাজকীয় সাজে। ডালে ডালে মুকুলের গুরুভার আর মৌমাছির গুঞ্জন জানাচ্ছে ‘ফলের রাজা’ আমের আগমনের বার্তা। বরাবরের মতো এবারও সাতক্ষীরার বাগানগুলোতে মুকুলের আগাম জোয়ারে চাষির চোখে সোনালি স্বপ্ন ফুটে উঠেছে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় ৫ হাজার বাণিজ্যিক বাগানে ৪ হাজার ১১৮ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ল্যাংড়া, হিমসাগর, গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ ও আম্রপালির মতো জনপ্রিয় জাতের গাছগুলো প্রায় ৯৫ শতাংশ মুকুলে ঢাকা। চাষিরা এখন দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না; কেউ হুপার পোকার আক্রমণ রোধে স্প্রে করছেন, কেউ গাছের গোড়ায় সেচ দিয়ে মুকুল ঝরা রোধে বিশেষ যত্ন নিচ্ছেন।
ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত কারণে দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় সাতক্ষীরার আম ২০-২৫ দিন আগেই পাক ধরেছে। বাজারে সবার আগে সাতক্ষীরার সুস্বাদু ও বিষমুক্ত আম পাওয়া যায়, যার কারণে দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এর চাহিদা বাড়ছে। এ বছরও ৩০০ বাছাইকৃত বাগান আলাদাভাবে চাষ করা হচ্ছে বলে কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে। মুকুলের জৌলুস দেখে ইতোমধ্যেই বাইরের জেলার ব্যবসায়ীরা বাগান লিজ নিতে শুরু করেছেন। তবে একটাই শঙ্কা—হঠাৎ কালবৈশাখী বা বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপপরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরা আমের আলাদা সুনাম থাকায় বিদেশে চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এ বছরও ৩০০ বাছাইকৃত বাগান থেকে আম রপ্তানি করা হবে। আমরা সব আম চাষিকে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পরামর্শ দিচ্ছি যাতে পোকার আক্রমণ বা সেচের অভাবে মুকুল নষ্ট না হয়। সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করলে কৃষকরা এবার বিপুল লাভবান হবেন।
আমবাগানের মালিকরা আশা প্রকাশ করেন, প্রকৃতির এই রূপ আর চাষিদের পরিশ্রম যদি সার্থক হয়, তবে আম্রকাননের এই সুবাস কেবল ঘ্রাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সাতক্ষীরা জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ফল হয়ে উঠবে।

