শেরপুর জেলার নকলা উপজেলায় চলতি রবি মৌসুমে গম চাষে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। এই মৌসুমে উপজেলার ২১০ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ করা হয়েছে। নামমাত্র শ্রম, অল্প ব্যয় ও স্বল্প সময়ে গমের আবাদ করে কৃষকরা অধিক লাভ পাচ্ছেন। এছাড়া সময়মতো প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষি বিভাগ থেকে বীজ, সার ও প্রযুক্তিগত পরামর্শ পাওয়ায় কৃষকেরা গম চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
গমের আবাদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবছর উপজেলার ১৬০ জন কৃষকের মাঝে উন্নতমানের গমের বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণ করা হয়েছে। কৃষকরা মনে করছেন, প্রণোদনা সহায়তা ও নিয়মিত কৃষি পরামর্শ চাষাবাদে ঝুঁকি কমিয়েছে এবং উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, গম চাষ সম্প্রসারণ ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যে চলতি মৌসুমে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় মোট ১০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব প্রকল্পের অধীনে ৩টি, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় ৩টি এবং গম গবেষণা কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে ৪টি প্রদর্শনী প্লট রয়েছে। সবুজে মোড়া মাঠে এখন গমের শীষ দোল খাচ্ছে বাতাসে। প্রদর্শনী প্লটে উন্নত জাতের গম, সুষম সার ব্যবহার এবং সমন্বিত রোগবালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হচ্ছে, যা দেখে স্থানীয় কৃষকেরা উৎসাহিত হচ্ছেন।
মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা জানান, প্রদর্শনী প্লটগুলোতে উন্নত জাতের গম উৎপাদন, সুষম সার ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক চাষপদ্ধতির ব্যবহার দেখানো হচ্ছে। এসব প্লট দেখে আশপাশের কৃষকেরাও গম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষকরা দাবি করেছেন, সময়মতো সহায়তা পাওয়ায় তারা গম চাষে উৎসাহিত হয়েছেন। প্রণোদনা সহায়তা শুধু উৎপাদন বাড়াবে না, বরং কৃষকদের আর্থিক ঝুঁকিও কমাবে বলে মনে করছেন তারা।
এ বছর উপজেলার বানেশ্বরদী, পাঠাকাটা, টালকী, চরঅষ্টধর ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি গম চাষ হয়েছে। এছাড়াও গণপদ্দী, নকলা, উরফা, গৌড়দ্বার ইউনিয়নসহ নকলা পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা নিজ উদ্যোগে গম চাষ করেছেন। এসব এলাকায় মাটির গুণাগুণ ও সেচ সুবিধা ভালো থাকার পাশাপাশি আবহাওয়াও গম চাষে অনুকূল থাকায় কৃষকের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। অনেক কৃষক ধানের পাশাপাশি বিকল্প ফসল হিসেবে গম বেছে নিচ্ছেন, যাতে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
ভূরদী খন্দকারপাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ্জ মো. ছায়েদুল হক জানান, নকলার প্রায় সব এলাকাতেই কম-বেশি গমের আবাদ হয়েছে। মাঠে যে সবুজ স্বপ্নের ফসল আছে, তা শুধু গমের শীষ নয়; এটি কৃষকের আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্ন পূরণের প্রতিচ্ছবি। তিনি আরও জানান, সংস্থার অধিকাংশ কৃষক ধানসহ অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি গম চাষ করেছেন। চাহিদা বেশি ও ভালো দাম থাকায় আগামীতে কমবেশি সবাই গম চাষ করবেন।
বানেশ্বরদী ইউনিয়নের বানেশ্বরদী গ্রামের কৃষক শিবলু মিয়া জানান, বাংলাদেশ ভুট্টা ও গম গবেষণা কেন্দ্রের আওতায় জমির ২০ শতাংশে প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন। এছাড়াও উপজেলা ও মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা মাঝে মাঝে সরাসরি এবং মোবাইলে খোঁজখবর নিচ্ছেন। নামমাত্র খরচে গম চাষে ঝুঁকি নেই; তবে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েছে। ধানের তুলনায় গমে বেশি লাভ হবে বলে জানান এই শিক্ষিত তরুণ কৃষক।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান জানান, চলতি মৌসুমে সরাসরি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফরের সহায়তায় বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে গমের আবাদ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি এই খাদ্যশস্য চাষে কৃষকরা বেশি লাভ পাচ্ছেন। অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে থাকলে এবং বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে এ বছর গমের বাম্পার ফলন হবে। এটি স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষকদের বাড়তি আয়েও সহায়ক হবে। পতিত ও অপেক্ষাকৃত অনুর্বর জমিতে গম চাষ করে যেকেউ স্বাবলম্বী হতে পারেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামীতে গমের আবাদ কয়েক গুণ বাড়বে, ফলে অনেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাবলম্বী হবেন। এই শস্য আবাদে ব্যয়ের তুলনায় কৃষকরা কয়েকগুণ লাভ পান। অধিক লাভজনক গম চাষ আগামীতে যেমন কৃষি অর্থনীতিতে সমবৃদ্ধি আনবে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।



