সবজি ভান্ডারখ্যাত শেরপুরের নকলা উপজেলায় এবার মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। বিশেষ করে উপজেলার চরঅষ্টধর, চন্দ্রকোনা, পঠাকাটা, উরফা, টালকী ও বানেশ্বরদী ইউনিয়নের খাল-বিল ও নদ-নদীর তীর এবং অপেক্ষাকৃত অনুর্বর ও পতিত জমিতে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ বেশি হয়েছে।
কুমড়া চাষে নামমাত্র শ্রম ও অল্প খরচে বেশি আয় করা যায়। এবার ভালো ফলনের পাশাপাশি ভালো দামও পাচ্ছেন কৃষকরা। এসব কারণে বারোমাসি এই সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন তারা।
নকলায় দিন দিন বাড়ছে মিষ্টি কুমড়ার আবাদ। বাম্পার ফলন ও ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার মিষ্টি কুমড়া যাচ্ছে ঢাকা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলার বাজারে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২৯৭ একর (১২০ হ্যাক্টর) জমিতে মিষ্টি কুমড়া আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ২৪ একর বেশি জমিতে আবাদ হয়ে মোট ৩২১ একর (১৩০ হেক্টর) জমিতে চাষ হয়েছে। এসব জমিতে বাণিজ্যিকভাবে উচ্চফলনশীল সুইটি, বেঙ্গল, মিনিস্টার ও রাজা জাতের মিষ্টি কুমড়ার আবাদ বেশি হয়েছে।
সরেজমিনে চরঅষ্টধর ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলায় অন্তত শত একর জমিতে চাষ করা গোল আলুর খেতে সাথি ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়া চাষ করা হচ্ছে।
পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি কৃষক পরিবারের বাড়ির আঙিনায়ও মিষ্টি কুমড়ার গাছ রয়েছে। এতে অতিরিক্ত আরও প্রায় ৫০ একর জমিতে কুমড়ার আবাদ হয়েছে বলে ধারণা করছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাসহ কৃষকরা।
চরঅষ্টধর ইউনিয়নের নারায়ণখোলা দক্ষিণপাড়া এলাকার কৃষক গোলাপ জল জানান, তিনি ৮০ শতাংশ জমিতে গোল আলুর সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়া চাষ করেছেন। গোল আলু উত্তোলনের পর কুমড়ার গাছ পুরো জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বাড়তি খরচ খুব কম হয়েছে।
তিনি জানান, ১৪ প্যাকেট বীজ, দুবার হালকা সেচ, একবার নিড়ানি ও সামান্য জৈব সার ব্যবহার করে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত তিনি ৭০ হাজার টাকার কুমড়া বিক্রি করেছেন। আরও ২০-২৫ হাজার টাকার কুমড়া বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন।
তিনি বলেন, ‘একই জমিতে দুই ধরনের ফসল পাওয়া যায়। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এটি লাভজনক চাষ।’
অন্য কৃষক আকবর আলী জানান, আগে অনুর্বর জমিতে বিভিন্ন ফসল চাষ করেও লাভ কম হতো। কৃষি অফিসের পরামর্শে এখন মিষ্টি কুমড়া চাষ করে বেশি লাভ পাচ্ছেন। পাইকাররা সরাসরি জমি থেকে কুমড়া কিনে নেওয়ায় বিপণন ঝামেলাও কমেছে।
তিনি জানান, মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি ২০-২৫ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে ১২-১৫ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে।
শাক-সবজির পাইকার আব্দুল হালিম, মোতালেব, মোকসেদ ও সজিব জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে মৌসুমি সবজি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এখান থেকে কুমড়া কিনে ঢাকা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। অনেকে জমি চুক্তিতে নিয়ে কুমড়ার গাছসহ কিনে থাকেন। এতে বছরে ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় হয় বলে জানান তারা।
ভূরদী খন্দকারপাড়া কৃষিপণ্য উৎপাদক কল্যাণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ মো. ছায়েদুল হক জানান, নকলার উঁচু এলাকাগুলোতে ব্যাপকভাবে মিষ্টি কুমড়া চাষ হচ্ছে। কুমড়ার শাক পুষ্টিকর হওয়ায় এর চাহিদাও বেশি। শীতকালীন ফসলের জন্য অক্টোবর-ডিসেম্বর এবং গ্রীষ্মকালীন ফসলের জন্য ফেব্রুয়ারি-মে পর্যন্ত বীজ বপন করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাগর চন্দ্র দে জানান, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার ভালো ফলন হয়েছে। বাজারদর ভালো থাকায় কৃষকরাও সন্তুষ্ট। অনুর্বর জমিতে সবজি চাষে উৎসাহ দেওয়ায় প্রতি বছর আবাদ বাড়ছে।
অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ তাবাসসুম মকবুলা দিশা বলেন, কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন হওয়ায় আগামীতে আরও কৃষক এ চাষে আগ্রহী হবেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল ওয়াহেদ খান জানান, স্বল্প মেয়াদি এ সবজি চাষে লাভ বেশি। সঠিক পরিচর্যা ও অনুকূল আবহাওয়া থাকলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন।
তিনি বলেন, ‘অল্প খরচে ও স্বল্প শ্রমে মিষ্টি কুমড়া চাষ করে যে কেউ স্বাবলম্বী হতে পারেন।’ ভবিষ্যতে এ খাতে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সহায়তা ও উপকরণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।


