ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর শেরপুর জেলা কেন অবহেলিত

মো. সলিমুল্লাহ সেলিম
প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০১:১০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত ময়মনসিংহ বিভাগের একটি ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান স্থান হলো শেরপুর জেলা। ১ হাজার ৩৬৩.৭৬ বর্গকিলোমিটারের জেলাটি প্রথমে ময়মনসিংহের একটি মহকুমা ছিল, যা ১৯৮৪ সালে জেলায় রূপান্তরিত হয়। ঢাকা থেকে প্রায় ১৯৫-২০০ কি.মি. উত্তরে অবস্থিত এই জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে জামালপুর ও ময়মনসিংহ জেলা।

শেরপুর জেলা মোট পাঁচটি উপজেলায় বিভক্ত, শেরপুর সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও নকলা। পাহাড়ি সৌন্দর্য এবং প্রাকৃতিক বিনোদনের জন্য শেরপুর বেশ সমাদৃত। এখানকার প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে গজনী অবকাশ কেন্দ্র, মধুটিলা ইকোপার্ক, চা বাগান, শ্রীবরদী এবং নালিতাবাড়ীর রাবার ড্যাম। গারো পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নাকুগাঁও স্থলবন্দর এবং জিআই পণ্য, ছানার পায়েসের জন্য শেরপুর বিশেষভাবে পরিচিত। ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষা এই জেলাটির সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পর্যটনের জন্য দেশজুড়ে আলাদা কদর রয়েছে।

শেরপুরের বিখ্যাত হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:

গারো পাহাড় ও পর্যটন কেন্দ্র : শেরপুরের ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় অবস্থিত ভারতের মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা গারো পাহাড়ের পাদদেশ। এখানে অন্যতম জনপ্রিয় আকর্ষণ হলো গজনী অবকাশ কেন্দ্র, মধুটিলা ইকোপার্ক এবং বাওয়াছড়া লেক।

ছানার পায়েস : শেরপুরের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি জাতীয় খাবার হলো ছানার পায়েস। স্থানীয়ভাবে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং জিআই (এও) পণ্য হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছে।

নাকুগাঁও স্থলবন্দর : নালিতাবাড়ী উপজেলায় অবস্থিত এই বন্দরটি দিয়ে ভারতের সাথে পাথর, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে।

তুলসীমালা চাল : শেরপুরের মাটির বিশেষ গুণাগুণে উৎপাদিত এই সুগন্ধি চাল দেশ-বিদেশে বেশ সমাদৃত।

ঐতিহাসিক স্থান ও পুরাকীর্তি : শেরপুর জেলা নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। এখানকার মুঘল আমলের মাইসাহেবা মসজিদ, নালিতাবাড়ীর রাবার ড্যাম এবং বারোদুয়ারি মসজিদ বেশ দর্শনীয়।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস : ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শেরপুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের বহু স্মৃতিচিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে।

শেরপুর মূলত যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা, রেললাইনের অনুপস্থিতি, ভারী শিল্প কারখানার অভাব এবং পাহাড়ি ঢলে বন্যা ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একটি অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া জনপদ। এ ছাড়া, কৃষিপ্রধান জেলাটিতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে ব্যাপক মাত্রায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শেরপুরের পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হলো, রেল যোগাযোগ না থাকা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে শেরপুরের সরাসরি রেল যোগাযোগ নেই। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। অথচ স্বাধীনতার পর থেকেই রেললাইনের জন্য সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। এখন শেরপুরবাসীর প্রধান দাবি দ্রতগতিতে শেরপুরে রেললাইন স্থাপন করা।

অবহেলিত জনপদটি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ায় প্রতি বছর পাহাড়ি ঢলে ভোগাই, চেল্লাখালি ও সোমেশ্বরী নদীর পানিতে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয় এবং কৃষি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।

এখানে কোনো বৃহৎ ভারী শিল্প বা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া বিসিক শিল্পনগরী থাকলেও গ্যাস সংকট ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার নানা কারণে শিল্পায়ন কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত মধুটিলা ইকো পার্কের মতো অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রচারের অভাব এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে পর্যটনশিল্প থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব ও উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না।

জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শেরপুর। স্বাধীনতার পর ১৯৮৪ সালে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা থেকে পৃথক হয়ে শেরপুর জেলা গঠিত হয়। ১ হাজার ৩৬৩ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের জেলাটিতে বর্তমান আদমশুমারি অনুসারে জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের ওপরে ।

জেলাটি ছোট হলেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত এ অঞ্চলে রয়েছে নানা ঐতিহ্য ও দর্শনীয় স্থান। যা ভ্রমণপিপাসুদের দৃষ্টি কাড়বে। মসজিদ, জমিদার বাড়ি, মন্দির ছাড়াও ঐতিহ্যবাহী অবকাশ কেন্দ্র, পাহাড় ঘেরা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ইকোপার্ক, রাজার পাহাড় ও বাবেলাকোনা, নয়াবাড়ির টিলা, পানিহাটা-তারানি পাহাড় ও সুতানাল দীঘি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

শেরপুর শহরের কুসুমহাটি, গাজীরখামার, লসনমপুর, টেংরামারি, ভাতশালা, টাকিমারি, নবীনগর, সাপমারী, বাজিতখিলা, ফটিয়ামারি, হেরুয়া, রৌহা, খুনুয়া, কুমড়ার চর, কামার চর, বলাইর চর, চরশাব্দী, চরসুচারিয়া, নলবাইদ, সাতপাইক্যা, ইলশা, টিকারচর, ডুবারচর, পাকুরিয়া, কামারিয়া, আলিনাপাড়া, আন্ধারিয়া, সূর্যদি, ভীমগঞ্জ, বয়রা, দীঘারপাড়, কালিগঞ্জ যোগিনিমুরা, ঘুঘুরাকান্দি, বারগড়িয়া, তারাকান্দি ও কসবা পরিচিত কয়েকটি গ্রাম ও এলাকার নাম।

এ ছাড়াও চারদিকে পরিখাবেষ্টিত মোগলবাড়ী, কাছারী পাড়া, তার পশ্চিমে কাঠগড়, তার উত্তর পশ্চিমে বিচারক কাজীদের বসতবাড়ি কাজী গলী, কাজী গলী মসজিদ, দরবেশ শাহ কামালের দরগাহ, ধোপা ঘাট, নাপিত বাড়ি নামের স্থানগুলোর মাধ্যমে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

শেরপুরে বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজ রয়েছে। যার মধ্যে ১৮৮৭ সালে মহারানী ভিক্টোরিয়ার নামে ভিক্টোরিয়া একাডেমি। আড়াই আনী ও পৌনে তিনআনী জমিদারদের উদ্যোগে ১৯১৮-১৯ সালে গোবিন্দ কুমার পিস মেমোরিয়াল (জি,কে,পি,এম) স্কুল অন্যতম।

এ ছাড়াও পাকিস্তান আমলে ১৯৪৯ সালে শেরপুর বালিকা বিদ্যালয়, ১৯৫৭ সালে সরকারি কৃষি প্রশিক্ষায়তন, ১৯৬৪ সালে শেরপুর কলেজ। এরপর এসএম মডেল স্কুল, প্রতি উপজেলায় হাইস্কুল, স্বাধীনতা উত্তরকালে শেরপুর মহিলা কলেজ, ডা. সেকান্দর আলী কলেজ, পলিটেকনিক স্কুল, ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছাড়াও শেরপুর জেলার প্রতি উপজেলায়ও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শেরপুর তেরাবাজার জামিয়া সিদ্দিকীয়া মাদ্রাসাটি জেলার বৃহত্তম কওমি মাদ্রাসা। ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার কারিকুলাম অনুসারে এতে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত শিক্ষাক্রম পরিচালিত হয়। প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে গড়জড়িপার বারো দুয়ারি মসজিদ, মাইসাহেবার মসজিদ ও খরমপুর জামে মসজিদ দুটি ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

মসজিদের পাশাপাশি প্রাচীন তিনটি মন্দিরের মধ্যে একটি শ্রী শ্রী রঘুনাথ জিউর মন্দির, শ্রী শ্রী মা ভবতারা মন্দির এবং শ্রী শ্রী প্যারিমোহন মন্দিরও রয়েছে। শেরপুর রোটারি ক্লাব ও রেড ক্রিসেন্ট রোডে শনি মন্দিরটি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ মন্দির হিসেবে শেরপুরে পরিচিত।

বর্তমানে শেরপুরে দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে গজনী অবকাশ, মধুটিলা ইকোপার্ক ছাড়াও আরও রয়েছে- নেওয়াবাড়ি টিলা, শের আলী গাজীর মাজার, জরিপ শাহর মাজার, শাহ কামালের মাজার, ঘাগড়া লস্কর খান মসজিদ, নয়ানী বাজার নাট মন্দির, রঘুনাথ জিউর মন্দির, জিকে পাইলট স্কুল, গড়জরিপা কালিদহ গাংয়ের ডিঙি, নালিতাবাড়ি ও শ্রীবরদীর বিখ্যাত রাবারড্যাম প্রভৃতি।