ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

নৌকার অনিশ্চিত জীবনের অবসান, ঘর পেলেন বৃদ্ধ দম্পতি

রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫, ০৪:১৩ পিএম
সিরাজগঞ্জের বৃদ্ধ দম্পতি পেলেন ঘর। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

চারদিকে নীরব জলরাশি, তার মাঝেই ভাসমান একটি ছোট্ট নৌকা—এই নৌকাতেই কেটেছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের জামাত আলী (৬৫) ও সখিনা বেগমের জীবনের বহু বছর। ঝড়-বৃষ্টি, শীত আর রোদের সঙ্গে লড়াই করেই নৌকাকে ঘর বানিয়ে দিন পার করতেন এই বৃদ্ধ দম্পতি। 

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিরাপদ একটি আশ্রয়ের স্বপ্ন যেন তাদের কাছে ছিল অধরাই। স্থায়ী ঠিকানা না থাকা, নিরাপত্তাহীন জীবন আর মানবেতর কষ্ট—সব মিলিয়ে তাদের জীবন প্রশ্ন তুলেছিল সমাজের বিবেকের কাছে।

এই বাস্তবতা উঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে। সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নজরে আসে মানবিক সংগঠন ‘হাউজ অব মান্নান চ্যারিটেবল ট্রাস্টে’র।

সংগঠনটির অর্থায়নে এবং ‘প্রচেষ্টা সবার জন্য’ নামের মানবিক উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা সাহবাজ খান সানির তত্ত্বাবধানে বৃদ্ধ দম্পতির জন্য নির্মাণ করা হয় একটি টেকসই বসতঘর। ঘরের সঙ্গে যুক্ত করা হয় স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। পাশাপাশি দেওয়া হয় চৌকি, লেপ, বালিশসহ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী।

নিজস্ব জমি না থাকায় মানবিকতার অনন্য নজির স্থাপন করেন স্থানীয় দিনমজুর আলম শেখ। তিনি তার বাড়ির আঙিনায় বৃদ্ধ দম্পতির থাকার জন্য জায়গা দেন। স্থানীয়দের ভাষায়, এই সহানুভূতি ও সহমর্মিতা সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

নতুন ঘরের বারান্দায় বসে আবেগ সংবরণ করতে না পেরে জামাত আলী বলেন, ‘জীবনের শেষ সময়ে একটা নিজের ঘর পাব, কখনো কল্পনাও করিনি। নৌকার কষ্টের দিনগুলো মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। আল্লাহ আজ আমাদের দিকে রহমতের দৃষ্টি দিয়েছেন।’

তার স্ত্রী সখিনা বেগম বলেন, ‘শীত আর বৃষ্টির রাতগুলো ছিল ভয়ংকর। আজ মনে হচ্ছে আমরা আবার মানুষ হিসেবে থাকার জায়গা পেলাম। যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আল্লাহ তাদের ভালো রাখুন।’

এ বিষয়ে সাহবাজ খান সানি বলেন, ‘গণমাধ্যমের কারণেই আমরা এই অসহায় দম্পতির কষ্টের কথা জানতে পেরেছি। স্থায়ী আশ্রয় মানুষের মৌলিক অধিকার। সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে একটু এগিয়ে আসে, তাহলে কেউ আর এভাবে ভাসমান জীবন কাটাতে বাধ্য হবে না।’

তিনি আরও জানান, এই উদ্যোগ একক নয়; গণমাধ্যমকর্মী, স্থানীয় জনগণ ও হাউজ অব মান্নান চ্যারিটেবল ট্রাস্টের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই সম্ভব হয়েছে এই মানবিক সহায়তা।

নৌকার অনিশ্চিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে একটি ছোট্ট ঘর ফিরিয়ে দিয়েছে তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা। এই ঘটনা প্রমাণ করে, মানবিক সাংবাদিকতা ও সামাজিক সহানুভূতি একসঙ্গে কাজ করলে বদলে যেতে পারে অসহায় মানুষের জীবন।