× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

জাহিদুল ইসলাম, জৈন্তাপুর (সিলেট)

প্রকাশিত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম

পাথরখেকোদের গ্রাসে বিলীন হচ্ছে জৈন্তিয়ার ৫০০ বছরের জাফলং রাজবাড়ী

জাহিদুল ইসলাম, জৈন্তাপুর (সিলেট)

প্রকাশিত: এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম

জৈন্তিয়ার ৫০০ বছরের জাফলং রাজবাড়ী। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

জৈন্তিয়ার ৫০০ বছরের জাফলং রাজবাড়ী। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

সিলেটের জাফলং বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জল আর পাহাড়ের মিতালি। কিন্তু সেই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আড়ালে আজ লুকিয়ে আছে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। প্রকৃতির রূপের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচশ বছর কিংবা তারও বেশি পুরনো ঐতিহ্যের সাক্ষী ‘জাফলং রাজবাড়ী’ এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। 

পাথরখেকোদের করাল গ্রাস এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় ইতিহাসের বুক চিরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শেকড়। জাফলং নদীর পাড়ে দাঁড়ালে এখন আর শুধু পাথরের ঠুনঠুন শব্দ শোনা যায় না, শোনা যায় ধসে পড়া প্রাচীন ইটের নীরব ক্রন্দন।

ইতিহাসের ধূলিমাখা পাতা উল্টলে দেখা যায়, বর্তমানের এই অবহেলিত জাফলং একসময় ছিল একটি স্বাধীন খণ্ডরাজ্যের রাজধানী। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে জৈন্তিয়া সাম্রাজ্য একীভূত হওয়ার আগে জাফলং ছিল অন্যতম শক্তিশালী খণ্ডরাজ্য। পরবর্তীতে রাজধানী নিজপাটে স্থানান্তরিত হলেও জৈন্তিয়ার রাজারা এই রাজবাড়ীটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন। 

আবার অনেক ইতিহাসবিদের দাবি, ১৩০০ সালেরও আগে এখানে ‘মাধুর মাস্কুট’ বা ‘মালনিয়াং’ রাজ্যের প্রতাপ ছিল। নিয়াং রাজা ও মাইলং রাজাদের সেই রাজকীয় আভিজাত্যের শেষ চিহ্ন হিসেবে রাজবাড়ীটি শত শত বছর ধরে টিকে ছিল।

১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর জৈন্তিয়া রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এই স্থাপনার অবক্ষয় শুরু হয়। দীর্ঘ ১১২ বছরের শাসনামলে ব্রিটিশরা এখান থেকে বিপুল সম্পদ আহরণ করলেও এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। সেই অবহেলার ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে সিলেট অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক নিদর্শন নিয়ে কাজ করছেন গবেষক ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহার। সম্প্রতি তিনি একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে রাজবাড়ীটি পরিদর্শনে গিয়ে ভয়াবহ চিত্র প্রত্যক্ষ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন ‘সিলেট ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ ট্রাস্ট’-এর সভাপতি ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম এবং সাংবাদিক আব্দুর রহমান হীরা। 

পরিদর্শন শেষে আসিফ আযহার বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমরা জাফলং রাজবাড়ী পরিদর্শনে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেছি তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। পাথরখেকোদের সীমাহীন লোভ আর তাণ্ডবে রাজধানীর মূল অংশ ইতিমধ্যে নদীগর্ভে সমাধি নিয়েছে। এমনকি প্রাচীন মাইলং রাজার বাড়িটিও ধ্বংসের চূড়ান্ত পর্যায়ে। পূর্বপাশের বড় অংশ ধসে পড়েছে। এটি শুধু একটি স্থাপনার ধ্বংস নয়, বরং আমাদের পাঁচশ বছরের ইতিহাসের সলিল সমাধি।’

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ীর পশ্চিম ও উত্তর দিকের দেওয়ালগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পূর্ব দিকের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন। দক্ষিণের প্রধান ফটকটি জরাজীর্ণ অবস্থায় কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে, যেন শেষ বিদায়ের অপেক্ষায়। অবাধ পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে মাটির গভীর থেকে ভিত্তি সরে যাচ্ছে। এর ফলে প্রতি বর্ষায় স্থাপনার অবশিষ্ট অংশগুলো আলগা হয়ে নদীতে ধসে পড়ছে। কৃত্রিম নদীভাঙন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কণ্ঠে আজ কেবলই হতাশা আর বেদনা। তাদের অভিযোগ, চোখের সামনে ইতিহাস ধ্বংস হয়ে গেলেও পাথরখেকোদের প্রভাবের কারণে তারা অসহায়। এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ‘এই রাজবাড়ীর ইটে আমাদের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস লেগে আছে। আজ টাকার লোভে কিছু মানুষ সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমরা আমাদের পরিচয় হারিয়ে ফেলছি।’

পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, জাফলং এলাকায় যেভাবে নির্বিচারে পাথর উত্তোলন চলছে, তা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের সামিল। অনেকেই একে সরাসরি ‘ঐতিহ্যিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল, ইতিহাস অনুরাগী ও পরিবেশবাদীরা অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রাজবাড়ী এলাকাকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা, নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে সব ধরনের পাথর উত্তোলন বন্ধ করা, নদীভাঙন রোধে টেকসই সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং অবশিষ্ট অংশগুলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার করা।

জাফলং রাজবাড়ী কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অস্তিত্বের প্রতীক। যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে এই প্রাচীন নিদর্শন চিরতরে হারিয়ে যাবে। এখনই প্রয়োজন প্রশাসনের দৃঢ় ও আন্তরিক উদ্যোগ, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই পাঁচশ বছরের ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত না হয়।

Link copied!