ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

টাঙ্গাইল হাসপাতালে শয্যার চেয়ে কয়েকগুণ রোগীর চাপ

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম
রোগীর অতিরিক্ত চাপে গাছের সঙ্গে স্যালাইন ঝুলিয়ে রোগীকে সেবা নিতে হচ্ছে। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল ও টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়াসহ শীতজনিত রোগীর চাপে চিকিৎসক ও নার্সরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। জেনারেল হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ভর্তি রয়েছে। গাছের সঙ্গে স্যালাইন ঝুলিয়ে রোগীকে সেবা দিতেও দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালে এসব রোগীর সেবা দিতে চরম সংকট তৈরি হয়েছে।

এদিকে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ড না থাকায় আক্রান্ত রোগীদের জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের অধিকাংশই শিশু ও প্রবীণ।

টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ১৩টি। গত পাঁচ দিনে শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত শুক্রবার ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ৭৮ জন, শনিবার ১০৯ জন, রোববার ৬৬ জন, সোমবার ৯৬ জন এবং মঙ্গলবার ৭৩ জন। এ হাসপাতালে নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে সাধারণ ১০টি ও পেইং ১০টি—মোট ২০টি শয্যা রয়েছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যাও শয্যার তুলনায় বেশি।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সেখানে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের জন্য কোনো আলাদা ওয়ার্ড নেই। ঠান্ডাজনিত রোগীদের মধ্যে যারা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত, শুধু তাদেরই চিকিৎসা দেওয়া হয়। সরাসরি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের পাশের জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ হাসপাতালে নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে ৪২টি শয্যার বিপরীতে ৬৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে সোমবার দুপুর পর্যন্ত ভর্তি রয়েছেন ৩৪ জন এবং রোববার ভর্তি ছিলেন ৩২ জন।

সরেজমিনে দেখা যায়, শীতজনিত রোগীর চাপে হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না। জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডের বিছানা, ফ্লোর ও বারান্দা রোগীতে ভরপুর। ডায়রিয়া ওয়ার্ডের আঙিনায় ছোট ছোট গাছের সঙ্গে স্যালাইন ঝুলিয়ে রোগীদের দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময়ই রোগীরা হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন না। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, বাইরে থেকে ওষুধ কিনে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্যালাইন ও ২-৪টি ট্যাবলেট ছাড়া জরুরি ওষুধ সরবরাহ করছে না। বাধ্য হয়ে রোগীর স্বজনরা বাইরে থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনছেন।

কালিহাতী থেকে আসা এক রোগীর স্বজন রকিবুল হাসান জানান, শিশুর ডায়রিয়া হওয়ায় তিনি রোববার দুপুরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর তার রোগীকে কোনো শয্যা বা বিছানা দেওয়া হয়নি। বাড়ি থেকে মাদুর এনে হাসপাতালের আঙিনায় বিছানা পেতে থাকতে হচ্ছে। সেখানে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে তার রোগীকে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। বাকি ওষুধগুলো তিনি বাইরের দোকান থেকে অতিরিক্ত দামে কিনেছেন।

দেলদুয়ারের আমিনুল, বাসাইলের নজমুল ইসলাম, সদর উপজেলার আকরাম আলীসহ বিভিন্ন রোগীর স্বজনরা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শুধু স্যালাইন ও ২-৪টি ট্যাবলেট দেয়। বাকি সব ওষুধ বাইরের দোকান থেকে কিনতে হয়। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনামূল্যে ভালো চিকিৎসা হয়—এই ধারণা নিয়ে তারা এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে ডায়রিয়ার কোনো রোগী ভর্তি না করে সবাইকে জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি, চরম ওষুধ সংকট ও অব্যবস্থাপনায় তাদের নাভিশ্বাস উঠে গেছে।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজন শহিদুল ও রাজিব বর্মণ অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ ২-১টি ওষুধ ছাড়া বাকি সব সরবরাহ করছে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে হাসপাতালের পরিবেশ নোংরা ও আবর্জনায় ভরা। স্যালাইন, ন্যাপকিন, সুচসহ সিরিঞ্জ, গজ-ব্যান্ডেজ হাসপাতালের পরিত্যক্ত স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। হাসপাতালে ঢুকলেই উৎকট গন্ধে অবস্থান করা দুরূহ হয়ে পড়ে।

টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান জানান, স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাইরে রোগী রাখতে হয়েছিল। মঙ্গলবার থেকে তাদের হাসপাতালের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রয়োজনে ৬ নম্বর ওয়ার্ডেও নেওয়া হবে। ওষুধের ঘাটতি পূরণে কিছু ওষুধ আনা হয়েছে এবং আরও ওষুধের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। ওষুধ এলে আর ঘাটতি থাকবে না।

তিনি আরও জানান, হাসপাতালে ১৭৮টি পদের বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৪৪ জন। এই স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলানো কষ্টকর। তারপরও রোগীদের সেবা দিতে চিকিৎসক ও নার্সরা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজের পরিচালক ডা. আব্দুল কুদ্দুছ জানান, তাদের হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ড না থাকায় এ ধরনের রোগী এলে পাশের জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে ৪২টি শয্যার বিপরীতে ৬৬ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ সময়ে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি। তাদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

তিনি দাবি করেন, তাদের হাসপাতালে ওষুধের কোনো ঘাটতি নেই। স্টোরে পর্যাপ্ত ওষুধ রয়েছে এবং রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী তা সরবরাহ করা হচ্ছে।