ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

রূপালী সাহিত্য
প্রকাশিত: মে ৮, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
ছবি : সংগৃহীত

আজ ২৫ বৈশাখ। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। প্রতি বছরই এই দিনে তার সাহিত্য, দর্শন ও সমাজভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তবে প্রশংসার পাশাপাশি একটি বিতর্কও ঘুরেফিরে সামনে আসে- তিনি কি সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই একটি কথার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়, ‘মূর্খের দেশে আবার কিসের বিশ্ববিদ্যালয়?’ এ বক্তব্যটি রবীন্দ্রনাথের নামে প্রচার করা হলেও, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের বড় একটি অংশ বলছেন, এই উক্তির কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়?

রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধিতার অভিযোগ নতুন নয়। বিষয়টি আলোচনায় আসে বিশেষ করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিনের একটি বইয়ের সূত্র ধরে। সেখানে দাবি করা হয়, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত এক সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন।

পরবর্তীতে এ দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গবেষক ও লেখকরা এ বিষয়ে তথ্যসূত্র জানতে চাইলে নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল হাজির করা যায়নি। বিভিন্ন ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনেও একই বিষয় উঠে আসে- রবীন্দ্রনাথের সরাসরি বিরোধিতার পক্ষে শক্ত প্রমাণ অনুপস্থিত।

১৯১২ সালের সেই দিন: রবীন্দ্রনাথ কোথায় ছিলেন?

ইতিহাসের দলিলপত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯১২ সালের মার্চ-এপ্রিল সময়ে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শিলাইদহে। তার রচনাবলির তারিখ ও স্থান বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।

রবীন্দ্রনাথ তার কবিতা, গান ও চিঠির নিচে সাধারণত রচনার স্থান ও তারিখ উল্লেখ করতেন। ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’ গানটির রচনাস্থল শিলাইদহ, তারিখ ১৪ চৈত্র ১৩১৮ বঙ্গাব্দ (২৭ মার্চ ১৯১২)। একইভাবে ‘এবার ভাসিয়ে দিতে হবে আমার এই তরী’ গানটিও তিনি শিলাইদহে বসেই এপ্রিল ১৯১২-তে লিখেছিলেন।

গবেষকদের মতে, তিনি কলকাতায় ফেরেন ১২ এপ্রিল ১৯১২। ফলে ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে তাঁর উপস্থিতির দাবিটি ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

তাহলে বিরোধিতার ধারণা এলো কীভাবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা যে হয়েছিল, তা সত্য। বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু অভিজাত সমাজের একটি অংশ নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব কমে যেতে পারে।

এই বিরোধিতাকারীদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং রাজনীতিবিদ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। যেহেতু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তিনি বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন, তাই অনেকেই ধারণা করতে শুরু করেন যে তিনিও হয়তো একই অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু ধারণা আর প্রমাণ এক নয়।

‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বিতর্ক

রবীন্দ্রনাথবিরোধী আলোচনায় আরেকটি বহুল প্রচলিত দাবি হলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নাকি কেউ কেউ ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলে বিদ্রূপ করতেন এবং এতে রবীন্দ্রনাথও যুক্ত ছিলেন।

এই দাবির সূত্র হিসেবে প্রায়ই ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের আত্মজীবনী জীবনের স্মৃতিদ্বীপের কথা বলা হয়। তবে বইটি বিশ্লেষণ করে গবেষকরা জানিয়েছেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে এমন কোনো সরাসরি মন্তব্য পাওয়া যায় না।

বরং জানা যায়, ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ নিজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফর করেছিলেন এবং সেখানে বক্তৃতাও দেন।

অভিযোগ বনাম ইতিহাস

রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিতর্কের পেছনে তৎকালীন রাজনীতি, শ্রেণিচেতনা এবং সাম্প্রদায়িক বাস্তবতার প্রভাব ছিল- এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তার অনেক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন—এই দাবির পক্ষে এখনো পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায়নি।

বরং বিভিন্ন গবেষণা, সময়রেখা ও তাঁর নিজস্ব রচনার তারিখ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভিযোগটির বড় অংশই অনুমাননির্ভর।