ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আর মাত্র এক সপ্তাহ। নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে মাঠে নেমেছে রাজনৈতিক দলগুলো। দিচ্ছে নানামুখী প্রতিশ্রুতি। এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের গেম চেঞ্জার হচ্ছেন তরুণ ভোটাররা। আর এই তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ হলো শিক্ষার্থী।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে বিপুল আগ্রহ-উদ্দীপনা ও প্রত্যাশা। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো কতটা আকৃষ্ট করতে পারছে শিক্ষার্থীদের?
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় তরুণ ভোটাররা রাজনৈতিকভাবে সচেতন, সেই সাথে তারা তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। এ ছাড়া তারা দ্রুত মত বদলাতে সক্ষম এবং সামাজিক প্রভাবের দিক থেকেও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে। এ কারণে জাতীয় নির্বাচনে তরুণরা কী সিদ্ধান্ত নেবে সেটাও আগেভাগে বলা যাচ্ছে না।
তারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র বা ইতিহাসের ভূমিকা অস্বীকার না করলেও তরুণদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আগামীতে তাদের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ইফাজ উদ্দিন আহমদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর দেশের জনগণ ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করতে পারেনি। এইবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষ ভোট দিয়ে তার পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবেন। কিন্তু বিগত সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ ছাড়া মাঠে অন্য কেউ না থাকায় বর্তমানে যারা প্রার্থী হিসেবে আছেন তাদের কাউকে জনগণ খুব একটা চেনেন না এবং তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত না, যার কারণে জনগণ প্রার্থী নির্বাচন করতে একপ্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আগামী নির্বাচনে একপ্রকার শঙ্কার জায়গা দেখতে পাচ্ছি। বেশির ভাগ প্রার্থী আকাশ-কুসুম ইশতেহার প্রচার করলেও সেখানে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কোনো কথা নেই। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে কিছু দলের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী আর নারীবিদ্বেষী কার্যক্রমে ব্যস্ত। তারা ক্ষমতায় যেতে পারলে এইসব কার্যক্রম আরও ভয়ংকর রূপ নেবে বলে আমার ধারণা। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে না পারলে নির্বাচনে হানাহানির ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।’
সরকারি তিতুমীর কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিলা পারভীন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘১৭ বছর পর আবারও দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুন্দরভাবে পরিচালিত হোক এই নির্বাচন। প্রতিযোগিতা থাকুক তবে সেটা ভালো কাজের প্রতিযোগিতা। জনগণের ভোটে যে দলই নির্বাচিত হোক না কেন সকলে মিলে যেন একটা সুন্দর দেশ গড়তে পারি। যে দেশে থাকবে না চাঁদাবাজি, থাকবে না দুর্নীতি। থাকবে শুধু শান্তি আর শৃঙ্খলা।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাজনীতি হোক সুন্দর প্রতিযোগিতার, বিরোধী দলের প্রতি থাকুক সম্মান। নতুন বাংলাদেশে আর কেউ রাজনীতির কারণে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হোক তা চাই না। ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, ‘শাসককে হতে হবে শৃগালের ন্যায় ধূর্ত এবং সিংহের ন্যায় তেজস্বী।’ এর অর্থ হলো রাষ্ট্র পরিচালনা করতে যেমন রূপ ধারণ করতে হবে ঠিক সেই রূপ ধারণ করা। আগামীর শাসক ঠিক তেমন গুণের অধিকারী হোক। এটাই প্রত্যাশা করব।’
কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজমের শিক্ষার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ আজম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বপ্ন আবার সামনে এসেছে। কিন্তু রাজনীতির মাঠে তাকালে সেই পুরোনো আচরণই চোখে পড়ে। প্রার্থী কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্র, হটকারিতা, চটকদার কিন্তু বাস্তবতাবিবর্জিত ইশতেহার—সবকিছু আগের মতোই আছে। খুব বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। এর ওপর নির্বাচন কমিশনের অকার্যকারিতা মানুষের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। নির্বাচন আদৌ কতটা সুষ্ঠু হবে, নাকি শুধু ক্ষমতার পালাবদলই ঘটবে—এই প্রশ্ন এখন অনেকের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাইনি। পরিবর্তনের যে আশ্বাস ছিল, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি বললেই চলে। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নির্বাচন নিয়েও মানুষের মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা ও হতাশা কাজ করছে। বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। যত দিন এই কাঠামোগত দুর্নীতি ও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভাঙা না যাবে, তত দিন নির্বাচন নিয়ে আশা আর হতাশার দোলাচল থেকেই যাবে।’
ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী স্বপন সূত্রধর রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আমাদের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার: সাম্য-মানবিক মর্যাদা-সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা শেষে কাজের নিশ্চয়তা। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নানামুখী সংকটে জর্জরিত। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীতেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থার পরিবর্তন সাধিত হয়নি। যেসব সংস্কারের প্রস্তাব ছিল তারও কোনোপ্রকার বাস্তবায়ন নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেকটা ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিতের বিষয়টি আমরা লক্ষ করছি না। শ্রেণিকক্ষ, তীব্র শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকট, মূল্যায়ন পদ্ধতি, আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থায় গভীর সংকট। আসন্ন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব সংকট সমাধান করবেন বলে প্রত্যাশা করি।’
যশোরের লাউড়ি রামনগর কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নাসিব হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রয়েছে নানা প্রত্যাশা ও স্বপ্ন। এই নির্বাচনকে শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে নয় বরং দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখতে চাই।’
তিনি জানান, দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণের জন্য যাকে যোগ্য মনে হবে, তাকেই ভোট দেবেন। দল বা ব্যক্তির চেয়ে দেশকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান তিনি। এমন একটি বাংলাদেশ চান, যা হবে সব মানুষের— কোনো এমপি বা মন্ত্রীকে কেন্দ্র করে নয়। দেশের শাসনব্যবস্থা হবে জনগণের জন্য, জনগণের স্বার্থে। সাধারণ মানুষের কথা শোনা হবে এবং তাদের অধিকার রক্ষা করা হবে—এটাই তার আশা।
নাসিব হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ হোক দুর্নীতিমুক্ত। উন্নত দেশগুলোর মতো এখানে ঘুষ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ হোক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক এবং সবাই আইনের চোখে সমান হোক।’
আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে—এমনটাই সব শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা।



