ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) প্রথমবারের মতো পরিচালিত সমন্বিত বৃক্ষ শুমারি-২০২৫-এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। শুমারিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৬২টি গোত্রের ২৭৭টি প্রজাতির মোট ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষ শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের বৃক্ষসম্পদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, পরিবেশগত অবদান, কার্বন মজুদ, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং অবস্থানভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক তথ্যভাণ্ডারও তৈরি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই শুমারির ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার এবং আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবির।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ সংসদ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ইকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বৃক্ষ শুমারির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বৃক্ষসম্পদ সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে সবুজায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি দেশীয় ও পরিবেশবান্ধব প্রজাতির বৃক্ষরোপণ সম্প্রসারণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সবুজ, নান্দনিক ও টেকসই ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ও কার্যকর পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এমন একটি ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শনার্থীরা নির্মল পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারবেন। একই সঙ্গে ফলজ ও উপকারী বৃক্ষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, এই বৃক্ষ শুমারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই সবুজায়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তিনি বায়ুদূষণ সহনশীল দেশীয় বৃক্ষরোপণ, জলাধার সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই ক্যাম্পাস গঠনে বৃক্ষ শুমারি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ গাছ দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পর্যায়ক্রমে নতুন বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মোট ১৭ হাজার ১৬১টি বৃক্ষের মধ্যে প্রজাতির হিসেবে ৫৮ শতাংশ দেশীয় এবং ৪২ শতাংশ বিদেশি। তবে বৃক্ষসংখ্যার ভিত্তিতে দেশীয় ও বিদেশি বৃক্ষের অনুপাত যথাক্রমে ৫৪ ও ৪৬ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ১৫টি প্রজাতির মধ্যে পাঁচটি বিদেশি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে মেহগনি, দেবদারু, ম্যাকারথুরি পাম, রেইনট্রি ও সেগুন উল্লেখযোগ্য।
শুমারিতে আরও দেখা গেছে, ক্যাম্পাসের বৃক্ষসমূহের মোট ভূ-উপরিভাগীয় জীবভর ৯ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন এবং ভূ-নিম্নীয় জীবভর ২ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন। এসব বৃক্ষের মাধ্যমে মোট ৪ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন কার্বন মজুদ রয়েছে। জীবভরের ক্ষেত্রে দেশীয় বৃক্ষের অবদান ২১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বিদেশি বৃক্ষের অবদান ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
উপযোগিতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষসম্পদের মধ্যে ফলদ বৃক্ষ ২৫ শতাংশ, প্রাণিকূল সহায়ক বৃক্ষ ২২ শতাংশ, ঔষধি বৃক্ষ ২১ শতাংশ, কাঠ উৎপাদনকারী বৃক্ষ ২০ শতাংশ এবং শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ ১২ শতাংশ।
বৃক্ষের স্বাস্থ্য মূল্যায়নে মোট ১ হাজার ৮১১টি বৃক্ষকে বিভিন্ন মাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ এবং ২ হাজার ২১৩টি বৃক্ষকে সম্ভাব্য বৃক্ষজনিত বিপর্যয়ের (ট্রি হ্যাজার্ড) আওতাভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে পরিচালিত এই শুমারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে পাঁচটি প্রধান জরিপ একক ও ৪৫টির বেশি উপ-এককে ভাগ করে প্রতিটি বৃক্ষের তথ্য Direct Measurement Method অনুসরণ করে সংগ্রহ করা হয়। পরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য, জীবভর, কার্বন মজুদসহ বিভিন্ন সূচক নিরূপণ করা হয়। একই সঙ্গে Google My Maps ও ArcGIS-এর সহায়তায় একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল ও মানচিত্রভিত্তিক বৃক্ষ ডাটাবেজও তৈরি করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন