ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

অবশেষে ববির সেই ‘ভয়ংকর নারী কর্মকর্তা’ আইনি জালে

বরিশাল ব্যুরো
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) ভয়ংকর নারী কর্মকর্তা সেলিনা বেগমের অপকর্মের লাগাম টেনে ধরতে বাধ্য হয়েছেন আদালত। একাধিক প্রেম-বিয়ে এবং ব্ল্যাকমেইলিংসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত উচ্ছৃঙ্খল এই নারী কর্মকর্তাকে বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) কারাগারে পাঠিয়েছেন বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিট্রেট আদালত। খোদ আদালত এবং মামলা তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে ভুলভাল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত প্রমাণ পাওয়ায় বিচারক ববির শারীরিক শিক্ষা দপ্তরের সহকারী পরিচালক সেলিনা বেগমের বিরুদ্ধে এই ধরনের ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হলেন। বহু অঘটন পটিয়াসি ত্রিশোর্ধ্ব এই নারী এবার আইনি জালে জড়িয়ে যাওয়ার খবরে সরকারি কর্মকর্তাসহ প্রতারিত অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। 

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও বিভিন্ন সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের গুরু দায়িত্বে থেকে সেলিনা বেগম সরকারী কর্মকর্তাসহ বিভিন্নজনকে টার্গেট করে ফাঁদে ফেলেছেন। ভয়ংকার এই কর্মকর্তা হাত থেকে রেহাই পাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। কিন্তু তাদের অনেকে ইজ্জত হারানোর ভয়ে বিতর্কিত নারী সেলিমা বেগমের মুখ টাকা দিয়ে বন্ধ রেখেছেন। সেই শক্তিমান নারী কর্মকর্তা স্বয়ং আদালত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভুলভাল তথ্য দিয়ে বিভ্রন্ত করার অপরাধে ফেঁসে গেছেন।

আলোচিত এই মামলাটির বাদী লালমনিরহাট জেলা শিল্পকলা একাদেমির সাবেক কালচারাল অফিসার মোহাম্মাদ হাসানুর রশীদ। বরিশালে কর্মরত থাকা অবস্থায় হাসানুরের সাথে উচ্ছৃঙ্খল সেলিনা বেগমের হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক তৈরি হয়। একপর্যায়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত তারা বিবাহও করেন, যা নিয়ে কালচারাল কর্মকর্তার বড় স্ত্রীর সংসারে অশান্তি বা কলহ দেখা দেয়। এর কিছুদিন পরেই সেলিনার বেসামাল চলাচল এবং উগ্র আচরণ হাসান মাকছুদকে তিক্ত করে তোলে, ফলে বাধ্য হয়ে তিনি ওই নারীকে তালাকও দেন। কিন্তু বিতর্কিত সেলিনা কালচারাল অফিসার মাকছুদকে কিছুতেই হাত ছাড়া করতে চাচ্ছিলেন না।  

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তন হলে মোহাম্মাদ হাসানুর রশীদকে লালমনিরহাট জেলা শিল্পকলা একাদেমিতে বদলি করা হয়। বরিশাল থেকে ৫০৯ কিলোমিটার দূর জনপদে গিয়েও কালচারাল অফিসারের মুক্তি মেলেনি। বরং সেখানে যাওয়ার পরে সেলিনা বেগমের অত্যাচারের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। কর্মস্থল ফাঁকি দিয়ে তিনি প্রতি সপ্তাহে সেখানে গিয়ে হাসানুরকে শারীরিক ও মানসিক নিপিড়ন করতেন। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, লালমনিরহাট জেলা শিল্পকলা একাদেমির অফিস কক্ষে প্রবেশ করে কালচারাল অফিসার হাসানুর রশীদের ওপর অতর্কিত হামলা করেন সেলিনা বেগম। এতে আতঙ্কিত হয়ে অফিসে কর্মরত অনেকে রুমে প্রবেশ করলে তাদের উপস্থিতিতেই কর্মকর্তাকে লাথি-ঘুসি মারাসহ টেনে হিঁচড়ে গায়ে জামা খুলে ফেলতে দেখা যায়। 

এই ভিডিওটির পাশাপাশি সেলিনা বেগমের ধুমপান করাসহ বিভিন্ন অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির একাধিক ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে নেটিজেনদের মধ্যে তুমুল ক্ষোভ দেখা যায়। ভিডিওটি সংবাদ আকারে প্রচার-প্রকাশ করে টেলিভিশন মিডিয়াসহ একাধিক পত্র-পত্রিকা, যার প্রেক্ষিত ববির এই নারী কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের দাবিও উঠেছিল। এরপরে সেলিনা কিছুটা চেপে গেলেও ফেসবুকে মোহাম্মাদ হাসানুর রশীদকে নিয়ে নানান অপতথ্য ছড়িয়ে ইজ্জতহানি করেন। 

এতে অনেকেটা বাধ্য সাবেক স্ত্রী সেলিনার বিরদ্ধে বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালি মডেল থানায় বিভিন্ন ধারায় একটি মামলা করেন মোহাম্মাদ হাসানুর রশীদ। সেই মামলাটিতে বৃহস্পতিবার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নারী কর্মকর্তা হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক স্বংয় আদালত ও মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তাকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রন্ত করার অপরাধে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। 

হাসানুর রশীদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ ইমন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ‘সুন্দরী এই নারী ভয়ংকর সব অপরাধ করেছেন। এবং আদালত ও পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেন, এনিয়ে বিচারক সেলিনাকে সতর্ক করেছেন। এবং তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন।’

বৃহস্পতিবার দুপুরে দুর্ধর্ষ সেলিনা বেগমের কারাগারে যাওয়ার খবরটি কিছুক্ষণের মধ্যেই ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এবং এনিয়ে অসংখ্য মানুষকে স্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। পাশাপাশি নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও আহ্বান জানানো হয়। 

প্রতিষ্ঠানের নিম্নপদস্থ নারী কর্মকর্তা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে কারান্তরীণ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হয়। অনেকেই সেলিনার সম্পর্কে আগে বলেছিল, কিন্তু কেউ কখনও অভিযোগ করেননি। এখন তিনি একটি মামলায় কারাগারে গেছেন, আদালতে বিচার হচ্ছে। সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগে ব্যবস্থাগ্রহণ করা অসম্ভব।’

উচ্ছৃঙ্খল নারী কর্মকর্তা সেলিনা বেগম কারান্তীণ হওয়ার খবর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদেরও স্বস্তি দিয়েছে। তার ছবিসংবলিত কারাগারে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী ফেসবুক পোস্ট করে শাস্তি কামনা করাসহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুতির আবেদন রাখেন।