আজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানার জন্মদিন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি অনেকটাই মিম-সংস্কৃতির অংশ—অতিরঞ্জিত আবেগ, দীর্ঘশ্বাস, সংসারের দুঃখ-কষ্ট, কিংবা সেই বিখ্যাত ‘সেলাই মেশিন’-কেন্দ্রিক পারিবারিক নাটকের নায়িকা। বাংলাদেশের মূলধারার চলচ্চিত্রের স্মৃতিতে শাবানা যেন চিরকালই একজন স্ত্রী, ভাবী কিংবা মা; প্রেমিকা হিসেবে নয়, বরং ‘বাড়ির বউ’ হিসেবেই তার সবচেয়ে পরিচিত পরিচয়।
কিন্তু এই স্মৃতি অসম্পূর্ণ।
বাংলাদেশি দর্শকের চলচ্চিত্র-স্মৃতি মূলত আশির দশক থেকে শুরু হয়েছে বলা যায়। কারণ তার আগের সময়ের চলচ্চিত্র, পোস্টার, ফটোগ্রাফ কিংবা ভিডিও-আর্কাইভ খুব সীমিত। ফলে আমরা যে শাবানাকে চিনি, তিনি মূলত আশির দশকের শাবানা—সংসারকেন্দ্রিক, ত্যাগী, কান্নাভেজা চরিত্রের এক প্রতীক।
অথচ তার চলচ্চিত্রজীবনের শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে।
১৯৬৭ সালে পরিচালক এহতেশামের চলচ্চিত্র চকোরী দিয়ে দর্শকের নজরে আসেন শাবানা। সে সময় তিনি ছিলেন একেবারেই ভিন্ন এক পর্দা-ব্যক্তিত্ব—তরুণী, প্রাণবন্ত এবং প্রচলিত অর্থে গ্ল্যামারাস নায়িকা। বিশেষ করে ঢাকায় নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্রগুলোতে তার উপস্থিতি ছিল সেই সময়ের তারকাসুলভ আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র।
ষাট ও সত্তরের দশকে তিনি বহু উর্দু ও বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। স্বাধীনতার আগের পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্পে তিনি ছিলেন আধুনিকতার এক মুখ। পর্দায় তার উপস্থিতি, পোশাক, রোমান্টিক চরিত্র কিংবা নায়িকা-ইমেজ—সবকিছুই পরবর্তী দশকের শাবানা-চরিত্রের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে ভিন্ন।
কিন্তু ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস এখানে কাজ করেছে।
স্বাধীনতার পর ঢাকায় নির্মিত উর্দু চলচ্চিত্রগুলো ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতি থেকে প্রায় মুছে যায়। সেসব চলচ্চিত্র আর ‘বাংলাদেশি সিনেমা’ হিসেবে আলোচনায় থাকে না। ফলে সেই সময়কার শাবানাও হারিয়ে যান জনস্মৃতি থেকে। তার তরুণ বয়সের সৌন্দর্য, তারকাখ্যাতি এবং রোমান্টিক নায়িকা-পরিচয় ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়।
এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাবানা অবসর নেননি। বরং নিজের তারকা-ইমেজকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। তিনি নায়িকা থেকে স্ত্রী, স্ত্রী থেকে মা, এবং মা থেকে পারিবারিক ট্র্যাজেডির কেন্দ্রীয় চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে করতে তিনি যেন বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত পারিবারিক চলচ্চিত্রের এক প্রতীক হয়ে ওঠেন।
ফলে আজকের দর্শকের কাছে শাবানার পরিচয় প্রায় একমাত্রিক। তাকে মনে করা হয় কান্না, ত্যাগ আর সংসারের নিত্যসংগ্রামের নায়িকা হিসেবে। এমনকি কখনো কখনো সেই ইমেজ হাস্যরসের উপাদানেও পরিণত হয়েছে।
কিন্তু এই ইমেজের আড়ালে আরেকজন শাবানা আছেন—ষাট ও সত্তরের দশকের সেই তারকা, যিনি ছিলেন ঢাকার চলচ্চিত্রের অন্যতম গ্ল্যামার আইকন।
তার জন্মদিনে হয়তো সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় এটিই: বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে শাবানা শুধু হারিয়ে যাওয়া এক নায়িকা নন, বরং হারিয়ে যাওয়া এক স্মৃতিরও নাম। আমরা যাকে মনে রেখেছি, তিনি শাবানার শেষ অধ্যায়; অথচ তার প্রথম অধ্যায়ের গল্পটাই হয়তো আরও বেশি বিস্ময়কর।

