১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গোপসাগরের গভীরে ডুবে যায় পাকিস্তানের ‘পিএনএস গাজি’ নামের একটি সাবমেরিন। পরে সেই সাবমেরিনের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার দাবি করে ভারতীয় নৌবাহিনী। বিশাখাপত্তনম উপকূল থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ মিটার গভীরে ভারতীয় নৌবাহিনীর ডিপ সাবমার্জেন্স রেসকিউ ভেহিকেল (ডিএসআরভি) এই ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করে বলে জানায় ভারতের সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস।
পিএনএস গাজি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন একটি সাবমেরিন, যা প্রথমে মার্কিন নৌবাহিনীর অংশ ছিল। তখন এটি ইউএসএস ডিবালো নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে সামরিক সহায়তার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এই ডুবোজাহাজটি পাকিস্তান নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। পুরোনো হলেও দীর্ঘ সময় সমুদ্রের গভীরে গোপনে অবস্থান করার সক্ষমতার কারণে এটি ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অস্ত্র।
১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর করাচি বন্দর ছেড়ে প্রায় চার হাজার আটশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা করে পিএনএস গাজি। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারতের পূর্ব উপকূলে নৌ-মাইন স্থাপন করা এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর একমাত্র বিমানবাহী রণতরী আইএনএস বিক্রান্তকে ধ্বংস করা। সে সময় সাবমেরিনটিতে ৯৩ জন নাবিক ছিলেন, যাদের মধ্যে ১১ জন ছিলেন কর্মকর্তা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে পিএনএস গাজির উপস্থিতির খবরে ভারতীয় নৌবাহিনীতে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। সম্ভাব্য আক্রমণের আশঙ্কায় শুরু হয় ব্যাপক সাবমেরিনবিধ্বংসী অভিযান। পাকিস্তানি সাবমেরিনটির সন্ধানে ভারতীয় নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ ও সম্পদ মোতায়েন করা হয়, যা পূর্বাঞ্চলীয় নৌ নিরাপত্তাকে সাময়িকভাবে চাপে ফেলে।
ভারতের দাবি অনুযায়ী, পিএনএস গাজিকে ধ্বংস করার দায়িত্ব দেওয়া হয় আইএনএস রাজপুত নামের একটি রণতরীকে। সমুদ্রে সাবমেরিনটির অবস্থান শনাক্ত করার পর ডেপথ চার্জ নিক্ষেপের মাধ্যমে সেটিকে ধ্বংস করা হয়। তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, যান্ত্রিক ত্রুটি বা অভ্যন্তরীণ দুর্ঘটনার কারণেই সাবমেরিনটি ডুবে যায়।
এতে ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য আরও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি হয়। বিশেষ করে আইএনএস বিক্রান্ত নিরাপদ থাকায় পূর্ব পাকিস্তান উপকূলে ভারতীয় নৌ অভিযানের পথ অনেকটাই উন্মুক্ত হয়ে যায়, যা মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক গতিপথে প্রভাব ফেলে।
একই যুদ্ধে আরব সাগরে পাকিস্তানি সাবমেরিন পিএনএস হাঙ্গরের অভিযান প্রমাণ করে দেয়, একটি মাত্র সাবমেরিনও কতটা বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ৯ ডিসেম্বর রাতে পিএনএস হাঙ্গরের টর্পেডো হামলায় ভারতীয় ফ্রিগেট আইএনএস খুকরি ডুবে যায়। এতে ক্যাপ্টেনসহ ১৭৬ জন ভারতীয় নৌসেনা প্রাণ হারান, যা ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারতের সবচেয়ে বড় একক নৌ ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত।
আইএনএস খুকরি ডুবে যাওয়ার পর ভারতীয় নৌবাহিনী আরব সাগরে ব্যাপক সাবমেরিন শিকার অভিযান শুরু করতে বাধ্য হয়। ফলে করাচি বন্দরে পরিকল্পিত আরও একটি বড় নৌ হামলা বাতিল করা হয় এবং যুদ্ধের কৌশলগত ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে।
পিএনএস গাজির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার দাবি সেই উত্তাল সময়ের ইতিহাসকে নতুন করে সামনে এনেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন