একটি ক্যাম্পফায়ারের সামনে বসে থাকা- আগুনের নাচতে থাকা শিখা, কাঠ পোড়ার মৃদু কর্কশ শব্দ, ধোঁয়ার চেনা গন্ধ আর শরীরে ছড়িয়ে পড়া উষ্ণতা- এই অভিজ্ঞতা যেন ভাষার অতীত। পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতেই আগুনকে ঘিরে মানুষের এক অদ্ভুত টান লক্ষ করা যায়। প্রশ্ন হলো, কেন এই টান? প্রথম দৃষ্টিতে উত্তরটা সহজ- আগুন মানে উষ্ণতা, নিরাপত্তা আর রান্না করা খাবার। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগুনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু টিকে থাকার প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ নয়- এর শিকড় ছড়িয়ে আছে আমাদের বিবর্তন, সমাজবোধ, এমনকি আধ্যাত্মিকতার গভীর স্তরে।
আগুনে যেভাবে মন শান্ত হয়
আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ডি. লিন ২০১৪ সালে একটি ব্যতিক্রমধর্মী গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনি পরীক্ষা করে দেখেন- ক্যাম্পফায়ার কি সত্যিই মানুষকে শারীরবৃত্তীয়ভাবে শান্ত করে? ফলাফল ছিল চোখে পড়ার মতো। যেসব অংশগ্রহণকারী প্রাকৃতিক শব্দসহ আগুন জ্বলতে দেখেছিলেন, তাঁদের রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অর্থাৎ, আগুন সত্যিই মানুষকে শান্ত করে।
আরও মজার বিষয় হলো- শব্দ বাদ দিলে সেই শান্তির প্রভাব অনেকটাই কমে যায়। আগুনের দৃশ্য + শব্দ- এই যুগল অভিজ্ঞতাই মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি কাজ করে।
গবেষণায় দেখা যায়, যারা স্বভাবতই সামাজিক ও সহযোগিতাপ্রবণ, তাদের ক্ষেত্রে আগুনের প্রভাব আরও গভীর। এখান থেকেই গবেষকদের ধারণা, আগুনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক মূলত সামাজিক।
আগুন ও মানব বিবর্তন যেভাবে
বিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক মানুষ (হোমো সেপিয়েন্স) আবির্ভূত হওয়ার বহু আগেই আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিল আমাদের পূর্বপুরুষরা। কেউ বলেন ১০ লাখ বছর আগে, কেউবা বলেন অন্তত ৪-৭ লাখ বছর আগে।
এই সময়কালেই মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত বড় হতে শুরু করে। অনেক গবেষকের ধারণা, এই দুটি ঘটনা- আগুন নিয়ন্ত্রণ ও মস্তিষ্কের বিকাশ- আলাদা নয়।
গবেষক লিনের ভাষায়, ‘আগুন নিয়ন্ত্রণ মানেই যোগাযোগ, সহযোগিতা আর পরিকল্পনা। একজন মানুষের পক্ষে একা আগুন সামলানো সম্ভব নয়।’
আগুন রান্না করা খাবারকে সহজপাচ্য করেছে, দিয়েছে বেশি ক্যালোরি। একই সঙ্গে রাতের অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে সামাজিকতার সময় বাড়িয়েছে। দিনের কাজ শেষেও মানুষ একত্রে বসে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে- যা ভাষা, সংস্কৃতি ও সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে দেয়।
আগুনেই আধ্যাত্মিকতার জন্ম
কিছু সমাজবিজ্ঞানীর মতে, ক্যাম্পফায়ারের সম্মোহনী প্রভাব মানুষের চেতনায় পরিবর্তন এনেছিল। সমাজবিজ্ঞানী জেমস ম্যাকক্লেনন মনে করেন, এই আগুনঘেরা সন্ধ্যাগুলো থেকেই শামানবাদ, আধ্যাত্মিকতা, এমনকি ধর্মের সূচনা হতে পারে।
যদিও লিন মনে করেন, এটি পুরো গল্প নয়। তার মতে, ‘ধর্ম, ভাষা, সামাজিকতা- সবকিছুই একসঙ্গে বিকশিত হয়েছে। আগুন ছিল সেই অনুঘটক।’
আধুনিক ক্যাম্পফায়ার: টেলিভিশন?
আজকের দিনে খুব কম মানুষই আগুনের চারপাশে বসে দিন শেষ করেন। তবে গবেষকরা বলছেন, টেলিভিশন হয়তো আধুনিক ক্যাম্পফায়ারের ভূমিকা পালন করছে।
ঝিকিমিকি আলো, শব্দ, গল্প- পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বসে দেখা। আগুনের মতোই এটিও একটি অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার বিষয়।
লিন বলেন, ‘আগুন আর টেলিভিশনের মধ্যে মিল আছে। আলো, শব্দ আর নিমজ্জনের অনুভূতি- আমাদের চোখকে ধরে রাখে।’
কিন্তু স্মার্টফোন কি সেই আগুন? সমস্যা শুরু হয় এখানেই। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সামাজিকতার একটা ভ্রান্ত অনুভূতি দেয়। স্ক্রল করলেই ডোপামিন বা সেরোটোনিনের ক্ষুদ্র ডোজ- কিন্তু প্রকৃত সংযোগ নেই।
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার মানুষকে আরও একাকী করে তুলছে।
যদি পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখা হয় আধুনিক ক্যাম্পফায়ার, তাহলে একা একা ফোন স্ক্রল করা যেন- প্লাস্টিকের লাইটারের দিকে তাকিয়ে থাকার মতো।
সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

