ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে রিটার্নিং কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পোলিং কর্মকর্তা পর্যন্ত প্রায় লক্ষাধিক নির্বাচনি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু নির্বাচনে তাদের কাজ কী? নির্বাচনের দিন তাদের কে কী দায়িত্ব পালন করবেন? কারা তারা?
নির্বাচন কর্মকর্তা
বাংলাদেশের যেকোনো নির্বাচন আয়োজন ও নীতি-নির্ধারনের দায়িত্বে থাকে নির্বাচন কমিশন। তবে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বেশ কিছু পর্যায়ে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি অর্গানোগ্রাম অনুসরণ করা হয়। এতে সবার ওপরে থাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা। তাদের তত্ত্বাবধানেই সার্বিক ভোট প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তা কে?
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশন সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের উদ্দেশ্যে এক বা একাধিক নির্বাচনি এলাকার জন্য একজন রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করতে পারেন।
বাংলাদেশে কিছু উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা করা হলেও ১৯৭২ সাল থেকে পরবর্তী সব জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা ছিলেন জেলা প্রশাসকরা।
নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম জানান, নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন বাছাই, মনোনয়ন বাতিল, প্রার্থীর বৈধতা কিংবা প্রতীক বরাদ্দ– পুরো ভোট প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন যেসব নীতিনির্ধারনী সিদ্ধান্ত নেন, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ওপর।
এ ছাড়া প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার তালিকা তৈরি ও ভোটকেন্দ্র নির্বাচনের দায়িত্বও থাকে তাদের ওপর।
আইন অনুযায়ী ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তা বা ভোটার বা নির্বাচনি ফলাফলের ওপর প্রভাব বিস্তার করার প্রমাণ পেলে কারণ দর্শিয়ে ওই ব্যক্তি যেই হোক না কেন, তাকে প্রত্যাহার করা এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে শৃঙ্খলা ভাঙার অভিযোগ এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করার এখতিয়ার থাকে রিটার্নিং কর্মকর্তার।
এ ছাড়া নির্বাচন শেষ হবার পর বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে যে ফলাফল আসে, তা একসঙ্গে করে রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেন।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা
রিটার্নিং কর্মকর্তার সহায়ক হিসেবে কাজ করেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা। সাধারণত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও’দের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ ছাড়াও নির্বাচন কর্মকর্তা এবং সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রার্থীদের সাথে যোগাযোগ, প্রিজাইডিং কর্মকর্তা কারা হবে, ভোটের দায়িত্ব কারা পালন করবে এ ধরনের তালিকা প্রস্তুত করতে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সাহায্য করেন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা।
প্রিজাইডিং কর্মকর্তা
প্রতিটি নির্বাচন কেন্দ্রের কেন্দ্রপ্রধান হিসেবে কাজ করবেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা।
সাধারণত প্রিজাইডিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পান সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত/আধা স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও প্রতিষ্ঠানের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তারাও প্রিজাইডিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
নির্বাচনের আগেই প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এতে নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ এবং অন্যান্য বিষয়ে আচরণবিধি সম্পর্কে সার্বিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যেহেতু প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কেন্দ্রের মূল দায়িত্বে থাকেন, নির্বাচনের আগের রাত বা নির্বাচনের দিন ভোর থেকেই তার কাজ শুরু হয়। ব্যালট বাক্স, কাগজ, কালি, সিলসহ নানা নির্বাচনি সরঞ্জাম সংগ্রহ করে কেন্দ্রে আনার দায়িত্ব থাকে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার ওপর।
তিনি কোনো ভোটকক্ষে উপস্থিত থাকেন না। সার্বিক কেন্দ্রের দায়িত্ব থাকে তার ওপর। পরদিন ভোটের সময় আলাদা কক্ষের জন্য সরঞ্জাম বণ্টন এবং প্রস্তুতির নেতৃত্ব দেন তিনি। সাধারণত সকাল আটটা থেকে শুরু হওয়া ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্ন করতে এবং একইসঙ্গে সহকারী প্রিজাইডিং কমর্কর্তা ও পোলিং কর্মকর্তাদের সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন তিনি।
সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা
একটি কেন্দ্রে একাধিক বুথ বা ভোটকক্ষ থাকে। আর প্রতিটি ভোটকক্ষের দায়িত্বে থাকেন একজন করে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা। তারা মূলত প্রিজাইডিং কর্মকর্তার অধীনে কাজ করেন এবং তাকে সাহায্য করে থাকেন। বরাদ্দকৃত কক্ষে পোলিং কর্মকর্তাসহ সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা বসেন এবং কোন ভোটার কেন্দ্রে ঢুকলে তার পরিচয় শনাক্ত করেন। এ ছাড়া ভোটগ্রহণ শেষ হলে সব ব্যালট বক্স নিয়ে এক জায়গায় জড়ো করে ভোট গোনার কাজও করেন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা।
পোলিং কর্মকর্তা
প্রত্যেক ভোটকক্ষে একজন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার সঙ্গে দুই জন করে পোলিং কর্মকর্তা থাকেন। সাধারণত ভোটকক্ষে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার সহায়তার জন্যই তারা নিয়োজিত থাকেন। পোলিং কর্মকর্তার কাজই থাকে ভোটার তালিকা দেখে ভোট দিতে আসা ভোটারদের শনাক্ত করা।
পোলিং এজেন্ট
নির্বাচনের সময় ভোট পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিটি ভোটকক্ষে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীর একজন করে প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন, যাকে বলা হয় পোলিং এজেন্ট। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ২২ অনুচ্ছেদের (১) দফার বিধান অনুসারে প্রত্যেক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অথবা তার নির্বাচনি এজেন্ট ভোটগ্রহণের পূর্বে প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রের জন্য পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করতে পারবেন।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট
নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকেন। নির্বাচনে যে অনিয়ম হয়, সেগুলোর আইনগত দিক দেখার দায়িত্ব থাকে ম্যাজিস্ট্রেটদের। কেউ জালভোট দিতে আসলে বা কোন অনিয়মে ধরা পড়লে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক বিচার করে শাস্তি বা জরিমানা করেন।

