স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও দেশে গণতান্ত্রিক চর্চা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবেশ গড়ে না ওঠায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। তিনি বলেন, দীর্ঘ এই সময়ে বারবার একই চক্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতায় আসার পরই নির্বাচন ও ক্ষমতা ছাড়ার নিয়ম ভেঙে ফেলা হয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম হলে অনুষ্ঠিত ‘প্রকৃতি ও পরিবেশ: ছবিতে পৃথিবীর প্রতিধ্বনি’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
শারমিন এস মুরশিদ বলেন, যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারাই ঘোষণা দিয়েছে—আর সেভাবে নির্বাচন হবে না, ক্ষমতা হস্তান্তরও হবে না। এভাবেই কেটে গেছে ৫৪ বছর। আমরা আজও গণতন্ত্রের স্বস্তি অনুভব করতে পারিনি।
দেশের বর্তমান সংকটকে তিনি দীর্ঘদিনের অবক্ষয়ের ফল বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, এ দেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীরাই বারবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামনে থেকে লড়েছে। তিনি বলেন, এই সমাজ যেভাবে তৈরি হয়েছে, তার দায় যাদের হাতে—তারাই অপরাধী। আমরা বয়সে বড় হয়েছি, চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু দেখেছি আমাদের সন্তানরা জীবন দিয়ে দিয়েছে। তারা স্বৈরাচার হটাতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ভার শেষ পর্যন্ত অন্যদের হাতেই চলে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তুলে ধরে সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা বলেন, ১৯৭১ সালে ১৯ থেকে ২২ বছরের তরুণ, কৃষক ও সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন এবং তা প্রবীণদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তখনই গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় স্বাধীনতার এত বছর পরও গণতন্ত্রের সুফল পাওয়া যায়নি।
বর্তমান প্রজন্মের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আজকের তরুণেরা—জেন-জি—আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে নতুন বাংলাদেশ গড়া যায়। তারা বলছে, এই পুরোনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভাঙতেই হবে।
আগামী দিনের নির্বাচন ও নেতৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন নেতৃত্ব দরকার, যারা বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করে দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নিতে পারবে। বর্তমান কাঠামো অক্ষত রেখে আমরা বিশুদ্ধ পানি, সবুজ বন কিংবা শস্য-শ্যামল বাংলাদেশ ফিরে পাব না, যোগ করেন তিনি।
নিজেদের সরকার নিয়ে ওঠা সমালোচনার জবাবে শারমিন এস মুরশিদ বলেন, অনেকেই আঙুল তুলে বলেন এটি ‘এনজিও সরকার’। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, এনজিও সরকার হলে কী সমস্যা? আমরা তো বহু ধরনের সরকার দেখেছি। একজন সমাজবিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ কিংবা অধ্যাপক ইউনূসের মতো চিন্তাশীল মানুষ দেশ পরিচালনা করলে কী হতে পারে—সুযোগটা অন্তত দিন।
বক্তব্যের শেষভাগে তিনি জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বাস রাখুন, আমাদের সন্তানরাই পাহাড়সম বাধা সরিয়ে দিয়েছে। হাদি, আবু সাঈদ কিংবা সেই সাহসী মেয়েটিকে আমরা যেন ভুলে না যাই। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ১১ জন নারী শহীদ হয়েছেন। তাদের আত্মত্যাগ যেন কোনোভাবেই অর্থহীন না হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন