আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে সারা দেশে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মাঠে মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচনের নিরাপত্তা জোরদারে এবার প্রথমবারের মতো ইউএভি (আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল), ড্রোন ও বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এসব তথ্য জানান।
ইসি সানাউল্লাহ জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তবে শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ওই আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন মাঠ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবেন ২ হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।
নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন—
- ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার
- ৫৯৮ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার
- ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার
- ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার
- ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং অফিসার
সব মিলিয়ে ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি নির্বাচনি কাজে যুক্ত থাকবেন।
ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্র থেকেই প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে বলে জানান ইসি সানাউল্লাহ। এরপর দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় সহকারী রিটার্নিং অফিসারের স্বাক্ষরের মাধ্যমে ফলাফল রিটার্নিং অফিসারের কাছে যাবে এবং সেখান থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। কমিশনের ঘোষণামঞ্চ থেকেই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিটি কেন্দ্রে প্রার্থী বা তাদের এজেন্টদের উপস্থিতিতে ফলাফল ‘ফর্ম-১৮’-তে লিপিবদ্ধ করা হবে, যার ভিত্তিতে পরবর্তীতে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
ড্রোন, বডি ক্যামেরা ও সিসিটিভির নজরদারি
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন সম্পর্কে তিনি বলেন, এবার প্রায় ২৫ হাজার বডি-ওর্ন ক্যামেরা মাঠে থাকবে। এর মধ্যে কিছু আইপি-ভিত্তিক ক্যামেরা সরাসরি ফিড দেবে, আর কিছু লোকালভাবে রেকর্ড করবে। পাশাপাশি সারা দেশের ৯০ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
ভোটগ্রহণের সময় ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র
ভোটগ্রহণ চলবে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ের পরেও কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থানরত ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তিনি জানান, মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি ভোটকেন্দ্রে সশরীরে ভোটগ্রহণ হবে, যার মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল একসঙ্গেই গণনা ও ঘোষণা করা হবে বলে জানান এই কমিশনার। সাদা ব্যালট সংসদ নির্বাচনের জন্য এবং গোলাপি ব্যালট গণভোটের জন্য ব্যবহৃত হবে। দুটি ফলাফল একসঙ্গে ঘোষণার মাধ্যমে এজেন্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত ও কেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখা হবে।
মোবাইল ব্যবহার ও ভোটার স্লিপের নির্দেশনা
তিনি বলেন, গোপন কক্ষে ভোটারসহ কেউই মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না। সাংবাদিকরা নীতিমালা অনুসরণ করে দায়িত্ব পালনে মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন, তবে গোপন কক্ষে প্রবেশ বা লাইভ সম্প্রচার করতে পারবেন না।
ভোটার স্লিপে আয়তন ঠিক রেখে প্রার্থীর নাম বা প্রতীক সংযোজনের বিধান সংশোধন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অবৈধ অস্ত্র ও অর্থের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্র ও কালো টাকার প্রভাব ঠেকাতে কমিশন কঠোর অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৮৫০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে বিএফআইইউ-কে সতর্ক নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে তিনি বলেন, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট এবং রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের প্রতি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটদানের আহ্বান জানান।




