বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ যৌনপল্লি দৌলতদিয়া-তে জন্ম নেওয়া ‘পরিচয়হীন’ শিশুদের জীবনে অবশেষে এসেছে স্বীকৃতির আলো। দীর্ঘদিন বাবার নাম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে জন্মনিবন্ধন থেকে বঞ্চিত থাকা এসব শিশু এখন প্রথমবারের মতো সরকারি জন্মসনদ পেয়েছে। এতে বদলে যেতে শুরু করেছে তাদের ভবিষ্যৎ- শিক্ষা, পাসপোর্ট কিংবা ভোটাধিকারের মতো মৌলিক অধিকার পাওয়ার পথ এখন উন্মুক্ত।
দশকের পর দশক ধরে যৌনপল্লিতে জন্ম নেওয়া শিশুদের পরিচয় অনিশ্চিতই থেকে যেত। মা যৌনকর্মী, আর বাবার পরিচয় অজ্ঞাত- এই বাস্তবতায় আইনি জটিলতার কারণে জন্মনিবন্ধন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ফলে তারা হয়ে উঠত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাছে ‘অদৃশ্য নাগরিক’। স্কুলে ভর্তি, সরকারি সুবিধা কিংবা আইনি সুরক্ষা- সব ক্ষেত্রেই বাধার মুখে পড়তে হতো তাদের।
এই অচলাবস্থা ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে লন্ডনভিত্তিক সংস্থা ফ্রিডম ফান্ড এবং স্থানীয় কয়েকটি সংগঠন। তাদের প্রচেষ্টায় দৌলতদিয়াসহ বিভিন্ন যৌনপল্লির ৭০০-রও বেশি অনিবন্ধিত শিশুর জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে, এর মধ্যে দৌলতদিয়ার প্রায় ৪০০ শিশু রয়েছে।
ফ্রিডম ফান্ডের বাংলাদেশ প্রোগ্রাম ম্যানেজার খালেদা আক্তার জানান, ২০১৮ সালে কার্যকর হওয়া জন্মনিবন্ধন আইনের একটি উপেক্ষিত ধারাই এই পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। ওই ধারায় বাবা-মায়ের পূর্ণ তথ্য ছাড়াও শিশুর জন্মনিবন্ধন করার সুযোগ রাখা হয়। কিন্তু স্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাবে মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা বিষয়টি প্রয়োগ করতেন না। পরে বিষয়টি চিহ্নিত করে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রশাসনের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে কার্যকর করা সম্ভব হয়।
নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো যৌনপল্লিতে গিয়ে শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করে সরকারের কাছে জমা দেয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে আইনের এই ধারার গুরুত্ব বোঝাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। প্রচারণা সফল হওয়ায় এখন মায়েরা নিজেরাই অন্যদের সন্তানদের নিবন্ধনের জন্য উৎসাহিত করছেন।
গবেষক সাব্বির হোসেন জানান, আগে সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে পরিবারগুলো বিকল্প পথ খুঁজত। কেউ মাদরাসায় পাঠাতেন, কেউ পরিচিত কারও নাম বাবার স্থানে ব্যবহার করতেন। কিন্তু তা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত সমাধান।
জন্মসনদের অভাব কেবল অধিকার বঞ্চনাই নয়, শিশুদের মানবপাচার ও শোষণের ঝুঁকিতেও ফেলত। বয়স প্রমাণের নথি না থাকলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যৌনপল্লির অনেক কিশোরী অনিচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে, যাদের একটি অংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
খালেদা আক্তারের ভাষায়, ‘জন্মসনদ শুধু একটি কাগজ নয়- এটি নিরাপত্তা, অধিকার এবং ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। জন্মসনদ না থাকলে আপনি রাষ্ট্রের কাছে অদৃশ্য থেকে যান।’
এই পরিবর্তনের মানবিক দিকটিও স্পষ্ট। দৌলতদিয়ার এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরী জন্মসনদ পাওয়ার পর এখন স্কুলের উপবৃত্তি পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তার হাসিমুখই যেন প্রমাণ করে- স্বীকৃতি কেবল আইনি পরিচয় নয়, এটি আত্মমর্যাদা ও আশার নতুন সূচনা।
পরিচয়ের স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে যৌনপল্লিতে জন্ম নেওয়া এসব শিশু এখন আর ‘ভিন্ন জগতের বাসিন্দা’ নয়- তারা এই রাষ্ট্রের সমান অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

