ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের চারটি প্রকল্পে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বড় ধরনের জালিয়াতি হয়েছে। ড্রোন দিয়ে (ডিজিটাল) ভূমি জরিপ কাজের পুনঃদরপত্রে উল্লিখিত বাধ্যতামূলক শর্তগুলোর মধ্যে তিনটি পূরণ করেনি কোম্পানিগুলো। এদিকে শর্তভঙ্গ করলেও যেদিন বিএনপি সরকার গঠন করে, সেদিনই তড়িঘড়ি করে প্রকল্প কমিটির সদস্যরা ‘ইভ্যালুয়েশন’ সম্পন্ন করে ফাইল চূড়ান্ত করেন। আগামী ২ মার্চ চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রস্তাব রয়েছে। এটি প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কাজ। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ, যেটা মূলত প্রকল্পের বাজেট নির্ধারণ ও ব্যয়-সংক্রান্ত।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমি জরিপ পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পগুলো হলো- এসডি-১৮ (পটুয়াখালী), এসডি-১৭ (বরগুনা), এসডি-১৯ (সিরাজগঞ্জ) এবং এসডি-২০ (পাবনা)। জরিপ প্রকল্পের পুনঃটেন্ডারে ১৯৭টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করলেও ২১টি কোম্পানিকে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ফাইলটি বর্তমানে মহাপরিচালক (ডিজি) ও মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই-বাছাইয়ে সরকারের বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করেছে বলে বিশেষ একটি সূত্র জানায়। তবে নতুন করে ‘প্রকল্পের রি-ইভ্যালুয়েশন’ বা পুনঃমূল্যায়ন করা হলে তথ্য জালিয়াতির সব চিত্র মিলবে। এ বিষয়ে বিশেষ নথি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
দরপত্রে তিনটি শর্তকে বাধ্যতামূলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রথমত, ২০২০ সালের ড্রোন নিবন্ধন বিধিমালা অনুযায়ী নিবন্ধিত ড্রোন এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নীতিমালা অনুসারে লাইসেন্সধারী পাইলট থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ড্রোন আমদানির বৈধ কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকতে হবে। তৃতীয়ত, লিড ফার্মের ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী দরপত্রে শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কারণে তা বাতিল করা হলেও পুনঃদরপত্র প্রক্রিয়ায় শর্ত শিথিল করে কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যায়ন কমিটিতে পরিবর্তন আনার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রক্রিয়াগত নমনীয়তা দেখানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিজিটাল জরিপ (বিশেষ ড্রোন) পরিচালনার জন্য মূল্যায়ন শেষে ফাইলবন্দি হওয়া অধিকাংশ কোম্পানির বিশেষ ড্রোন নেই। ড্রোন পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স ও সার্টিফায়েড পাইলট বা নিজস্ব ‘সার্ভে গ্রেড’ নেই। এমনকি সিভিল এভিয়েশন বা সংশ্লিষ্ট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের প্রমাণপত্রও নেই। তথ্য অনুসারে, কোম্পানিগুলো নিজের নয়, বরং অ্যাসোসিয়েট পার্টনার প্রতিষ্ঠানের প্রমাণপত্র উপস্থাপন করে দরপত্রে অংশ নিয়েছে, যার সঙ্গে দরপত্রে উল্লিখিত বাধ্যতামূলক শর্তের কোনো মিল নেই।
দরপত্রের চাহিদা অনুসারে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আরও একবার এই টেন্ডার আহ্বান করা হয়। তবে ‘বাধ্যতামূলক’ শর্ত পূরণ করতে না পারায় তা বাতিল করে ফের দরপত্র আহ্বান করে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর।
পুনঃদরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর এই কাজের অভিজ্ঞতা বা দরপত্রের শর্তানুসারে রাষ্ট্রীয় কোনো সার্টিফিকেট নেই। তবুও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হলে দেশের সংবেদনশীল স্থানগুলোর চিত্র, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং গোপনীয় তথ্য ভিন্ন দেশের হাতে থাকবে।
দরপত্রের শর্তানুসারে- প্রথমত, ২০২০ সালের ড্রোন নিবন্ধন এবং ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইসিএও) এবং সিএএবি ড্রোন উড়াল নীতি অনুসারে পাইলটের নিজস্ব লাইসেন্স থাকতে হবে। সেটা না থাকলে ওই কোম্পানি অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারাবে।
দ্বিতীয়ত, আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের ড্রোন থাকার প্রমাণ হিসেবে দেশে আমদানি করার বৈধ কাগজপত্র থাকতে হবে। যাতে বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক।
তৃতীয়ত, অবশ্যই লিড ফার্মের ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অর্থাৎ ভূমির মালিকানা, সীমানা, পরিমাণ ও ব্যবহারের ধরন নির্ধারণের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং নিখুঁত জরিপ করার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।
তথ্য-প্রমাণ বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দরপত্রের শর্তানুসারে ইভ্যালুয়েশন হওয়া কোম্পানিগুলোর এমন যোগ্যতা নেই। তারপরও তড়িঘড়ি করে চারটি প্রকল্পের ইভ্যালুয়েশন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে সরকারের বিশেষ একটি গোয়েন্দা বিভাগ থেকে। একটি সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারের শর্ত শিথিল এবং ইভ্যালুয়েশন কমিটিতে (মূল্যায়ন কমিটি) বেআইনিভাবে রদবদল করা হয়। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি ও শর্ত শিথিলের বিষয়ে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেটের তৎপরতা শুরু হয়।
অভিযোগে আর বলা হয়েছে, দেশীয় কোম্পানির সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা থাকলেও বিদেশি কোম্পানিকে (বিশেষ করে ভারত ও জাপান) এই প্রকল্পে সংযুক্ত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় তথ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তথ্যের নিরাপত্তা সম্পর্কে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং সাইবার নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ব্যাকডোর প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর হাসান জোহা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ড্রোন জরিপে শর্তভঙ্গ মানে মূলত নিয়ন্ত্রণহীন ডেটা সংগ্রহ, যা সংবেদনশীল স্থাপনা এক্সপোজ করতে পারে। বিদেশি ফার্ম যুক্ত হওয়া মানে জিও স্পেশাল ডেটার ওপর সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এটি কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকি। এখনই কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দরকার।’
টেন্ডারের শর্তভঙ্গ সম্পর্কে জানতে চাইলে মূল্যায়ন কমিটির সদস্য এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের পরিচালক (ভূমি রেকর্ড) মো. মমীনুর রশিদ বলেন, ‘আমি সরকারের কাছে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে দায়বদ্ধ। তা ছাড়া এখনো উন্মুক্ত হয়নি, ২ তারিখে হবে।’ এ সময় তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আদৌ শর্তপূরণ হয়েছে কি না, আপনি কীভাবে জানলেন?’
মমীনুর রশিদ বলেন, ‘কে পাস করল, না কী করল, তা ২ তারিখের আগে বলার সুযোগ নাই। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।’
প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের ডিজিটাল ভূমি জরিপ পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প পরিচালক মো. শাফায়াত মাহবুব চৌধুরীকে গত রোববার দুপুরে কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভূমি ভবনে পাওয়া যায়নি। এরপর কয়েকবার তার মোবাইল ফোনে কল করা হয়। তাতেও উত্তর না পাওয়ায় হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন লিখে পাঠানো হয় তাকে। কিন্তু এতে কোনো কাজ হয়নি, মেলেনি উত্তর।
জরিপ কার্যক্রমে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. মাহমুদ হাসান বলেন, ‘আমরা আইনের ভেতরে আছি। ডাইরেক্টর পিডি আসুক, তিনি ভালো বলতে পারবেন। তার সঙ্গে কথা বলুন।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, ড্রোনভিত্তিক ডিজিটাল জরিপের মাধ্যমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানের উচ্চ রেজলিউশনের চিত্র ও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এ ধরনের তথ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট নথি ও অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানান তারা।




-20260212210640-20260223194822-20260223200552.webp)
সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন