সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসকে (৩ মে) সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এ বছরও ‘বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক’ প্রকাশ করেছে।
এ বছর বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, গত বছর এই অবস্থান ছিল ১৪৯তম। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে এবার বাংলাদেশের তিন ধাপ অবনতি হয়েছে। তবে তারপরও প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। অবনতি হয়েছে ট্রাম্পের অধীন যুক্তরাষ্ট্রেরও।
আরএসএফ-এর সূচক অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে এবং গত বছরের চেয়ে পিছিয়েছে তিন ধাপ।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্ধেকেরও বেশি দেশ ‘কঠিন’ অথবা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ পর্যায়ে যুক্ত হয়েছে।
সংগঠনটি বলেছে, গত ২৫ বছরের মধ্যে সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের গড় স্কোর এর আগে কখনো এত নিচে নামেনি।
আরএসএফ তাদের বিশ্লেষণে বলছে, ২০০১ সাল থেকে ক্রমেই কড়াকড়ি হয়ে ওঠা আইনি ব্যবস্থার বিস্তার—বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সাথে যুক্ত আইনগুলো ধীরে ধীরে তথ্য জানার অধিকারকে ক্ষয় করে যাচ্ছে। এমনকি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও এটা ঘটছে।
আমেরিকা মহাদেশে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সাত ধাপ নেমে গেছে এবং ল্যাটিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ সহিংসতা ও দমনপীড়নের আরো গভীর চক্রে ঢুকে পড়েছে।
কীভাবে স্কোরিং হয়?
আরএসএফ প্রতি বছর একটি সূচক প্রকাশ করে যেখানে দেখার চেষ্টা করা হয়, সাংবাদিকরা কতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং নিরাপত্তা—এই পাঁচটি দিক থেকে প্রতিটি দেশ বা অঞ্চলের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বাস্তব পরিস্থিতি ও বিভিন্ন জটিলতা উঠে আসে বলে আরএসএফ দাবি করে।
প্রতিটি সূচকের জন্য শূন্য থেকে ১০০ পর্যন্ত একটি সহায়ক স্কোর গণনা করা হয়।
যেসব দেশ ৮৫ থেকে ১০০ পয়েন্ট পায় তারা ‘ভালো’ (সবুজ); ৭০ থেকে ৮৫ পয়েন্ট ‘সন্তোষজনক’ (হলুদ); ৫৫ থেকে ৭০ পয়েন্ট ‘সমস্যাযুক্ত’ (হালকা কমলা); ৪০ থেকে ৫৫ পয়েন্ট ‘কঠিন’ (গাঢ় কমলা) এবং শূন্য থেকে ৪০ পয়েন্ট যারা যায় তাদের ‘খুব গুরুতর’ (গাঢ় লাল) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
যেসব দেশের পয়েন্ট বেশি সেগুলো তালিকার শুরুতে এবং যেসব দেশের পয়েন্ট কম, অর্থাৎ সাংবাদিকরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছেন সেসব দেশ তালিকার নিচের দিকে থাকে।
এ বছর তালিকার ১ নম্বর অবস্থনে রয়েছে নরওয়ে এবং ১৮০ নম্বরে আছে ইরিত্রিয়া। নরওয়ের স্কোর ৯২ দশমিক ৭২ এবং ইরিত্রিয়ার ১০ দশমিক ২৪।
যুদ্ধের প্রভাব
বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় চলমান যুদ্ধগুলো চলতি বছরে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনে (১৫৬তম), যেখানে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অভিযানে ২২০ জনেরও বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ৭০ জন পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারিয়েছেন।
অন্যদিকে, কোথাও কোথাও স্বৈরশাসিত সরকারগুলো সংবাদমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থায় আটকে রাখায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিস্থিতি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
এর উদাহরণ হিসেবে চীন (১৭৮তম), উত্তর কোরিয়া (১৭৯তম) ও ইরিত্রিয়ার নাম এসেছে।
এ ছাড়া গত ২৫ বছর ধরে পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দুটি অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এর প্রতিফলন দেখা যায় ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার (১৭২তম) অবস্থানে, যেটি ইউক্রেনেন সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে এখনো সবচেয়ে খারাপ দেশগুলোর একটি।
ইরানও (১৭৭তম) তালিকার তলানির কাছেই রয়ে গেছে। এর পেছনে দেশটির ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আক্রমণের প্রভাব রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের অবনতি
বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক যে অঞ্চলগুলো—পূর্ব ইউরোপ–মধ্য এশিয়া (ইইএসি) ও মধ্যপ্রাচ্য–উত্তর আফ্রিকা (মেনা)ই- ওই অঞ্চলগুলোর সাথে আমেরিকা মহাদেশের ২৮টি দেশকে তুলনা করা হয়েছে আরএসএফের প্রতিবেদনে।
এতে বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তার বারবার আক্রমণকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক নীতিতে রূপ দিয়েছেন, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র সূচকে সাত ধাপ নেমে ৬৪তম অবস্থানে গেছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাজেন্সি ফর গ্লোবাল মিডিয়ার (ইউএসএজিএম) কর্মী সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তের বৈশ্বিক প্রভাব পড়েছে; এর ফলে বহু দেশে ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ), রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টি (আরএফই/আরএল) এবং রেডিও ফ্রি এশিয়ার (আরএফএ) মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম বন্ধ, স্থগিত বা সংকুচিত করা হয়েছে—সেসব দেশে যেখানে এগুলো ছিল নির্ভরযোগ্য তথ্যের শেষ কয়েকটি উৎসের মধ্যে অন্যতম।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যা বলা হয়েছে
এ বছর বাংলাদেশের স্কোর দেখানো হয়েছে ৩৩.০৫, গতবছর যা ছিল ৩৩.৭১। গত বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৪৯তম অবস্থানে ছিল, যেখানে এবার তিন ধাপ পিছিয়ে ১৫২তম অবস্থানে রয়েছে দেশটি।
তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ৩১.৯৬ স্কোর নিয়ে ১৫৭তম স্থানে এবং পাকিস্তান ৩২.৬১ স্কোর নিয়ে ১৫৩তম স্থানে রয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা নিয়ে বিশ্লেষণে বলা আছে, বাংলাদেশের ১৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে এবং তাদের কাছে মূলধারার গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার খুব সীমিত। এ ছাড়াও বলা হয়েছে বাংলাদেশে খবর ও তথ্যের প্রচারে ইন্টারনেটের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে।
গণমাধ্যমের চিত্র
আরএসএফ বলছে, রাষ্ট্রীয় দুটি প্রধান সম্প্রচারমাধ্যম, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) কার্যক্রমে কোনো সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নেই; এগুলো কার্যত সরকারি প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করে।
তারা জানিয়েছে, বেসরকারি খাতের গণমাধ্যমের মধ্যে রয়েছে প্রায় তিন হাজার মুদ্রিত গণমাধ্যম, দৈনিক ও সাময়িকী, ৩০টি রেডিও স্টেশন- যার মধ্যে কিছু কমিউনিটি রেডিও আছে। ৩০টি টেলিভিশন চ্যানেল এবং কয়েক শ’ সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটও আছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে সরকারগুলো গণমাধ্যমকে মূলত যোগাযোগের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়।
তারা বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারও এর ব্যতিক্রম ছিল না যেখানে সেন্সরশিপ, অনলাইন হয়রানি, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার চাপ, বিচারিক হয়রানি, একাধিক কঠোর আইন, পুলিশি সহিংসতা এবং ক্ষমতাসীন দলের হামলার ঘটনা ঘটেছে।
‘শেখ হাসিনার সরকার সাংবাদিকতার পথে প্রতিবন্ধকতা অবিরাম বাড়িয়ে তোলে। এসব বাস্তবতায় সংবাদকক্ষগুলো সরকারকে চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে চলে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক সেন্সরশিপে আশ্রয় নেয়।’
আইনি কাঠামো
বাংলাদেশে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাস হওয়া সাইবার সিকিউরিটি আইনকে (সিএসএ) বিশ্বের অন্যতম কঠোর সাংবাদিক-বিরোধী আই নএবং ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের (ডিএসএ) একটি দুর্বল সংস্করণ বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে শেখ হাসিনার সরকারের আনা এই আইনের অধীনে ওয়ারেন্ট ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতার; ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ; ইচ্ছামতো অজুহাতে সূত্রের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
আরএসএফের ভাষ্য- ‘এমন পরিবেশে সংবাদকক্ষের সম্পাদকরা নিয়মিতভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক সেন্সরশিপে বাধ্য হয়েছেন।’
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
বেসরকারি মালিকানাধীন শীর্ষস্থানীয় অধিকাংশ গণমাধ্যমের মালিকানা রয়েছে অল্প কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর হাতে, যারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের সময় উঠে এসেছেন। তারা গণমাধ্যমকে প্রভাব বিস্তার ও মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে দেখেন এবং সে কারণে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষার চেয়ে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে অগ্রাধিকার দেন।
এ ছাড়া অনেক সংবাদপত্র এখনো সরকারি বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া অর্থ এবং আমদানিকৃত নিউজপ্রিন্টের ওপর নির্ভরশীল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার বলছে, সাংবাদিকতা পেশাটি এখনো মূলত পুরুষশাসিত, আর নারী সাংবাদিকরা হয়রানির সংস্কৃতির মুখোমুখি হন এবং নিজেদের অধিকার প্রকাশ্যে রক্ষার চেষ্টা করলে অনলাইন বিদ্বেষমূলক অভিযানের শিকার হন’- বলা হয়েছে আরএসএফের প্রতিবেদনে।
এ ছাড়াও বাংলাদেশে পুলিশি সহিংসতা, রাজনৈতিক কর্মীদের হামলা এবং অপরাধী গোষ্ঠীর পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঝুঁকির মুখে থাকা সাংবাদিকরা শেখ হাসিনার শাসনামলে বেশি অসুরক্ষিত ছিলেন; কারণ ওই সময় এসব সহিংসতার ঘটনা বিনা বিচারে থেকে গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও সাংবাদিক ও ব্লগারদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ও সাইবার সিকিউরিটি আইন প্রায়ই ব্যবহার করা হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, শেখ হাসিনার পতনের পর শুরু হওয়া রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযানের সময় ১৩০ জনেরও বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন মামলাও করা হয়। বিশেষ করে ‘হত্যা’ ও ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ অভিযোগে এদের মধ্যে পাঁচজন আটক হন।
সূত্র : বিবিসি

