পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। শনিবার থেকে যাত্রা শুরু হলেও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে আগামী সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত। এই সময় একদিকে যেমন ঢাকামুখী হবে কোরবানির পশুবাহী যানবাহন, অন্যদিকে লাখো মানুষ ছুটবে গ্রামের পথে। ফলে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে তীব্র যানজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশ ইতোমধ্যে দেশের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে ৯৪টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে, যেখানে ঈদযাত্রায় যানজট সৃষ্টি হতে পারে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে টোল প্লাজা, বড় মোড়, শিল্পাঞ্চল ও ব্যস্ত বাজার এলাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কের অবস্থা তুলনামূলক ভালো থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে শেষ মুহূর্তে দুর্ভোগ বাড়তে পারে।
বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, ঈদের আগে তিন থেকে চার দিনে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ত্যাগ করেন। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ রাজধানী ছাড়েন। তবে বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও অন্যান্য পরিবহনের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ যাত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে অযোগ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনও সড়কে নেমে পড়ে।
এবার ঈদ উপলক্ষে ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনের সরকারি ছুটি থাকলেও শেষ কয়েক দিনের ভিড় কমবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গগামী পথে ২৫টি, চট্টগ্রামমুখী পথে ২৫টি এবং সিলেটমুখী পথে ২১টি পয়েন্টকে যানজটপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা এলাকায় চলমান চার লেন প্রকল্পের কিছু কাজ এখনো অসম্পূর্ণ থাকায় সেখানে জটের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পোশাক কারখানার কারণে মহাসড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন কারখানার সামনে মহাসড়কের বিভাজক কেটে পারাপারের ব্যবস্থা থাকায় দুর্ঘটনা ও ধীরগতির শঙ্কাও বাড়ছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে আশুগঞ্জ গোলচত্বর ও বিশ্বরোড মোড় গত কয়েক ঈদেই ভোগান্তির কারণ হয়েছিল। চলমান উন্নয়নকাজ, খানাখন্দ ও অব্যবস্থাপনার কারণে এবারও একই পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চল ঘিরেও যানজটের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজা দীর্ঘদিন ধরেই যানজটের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া কুমিল্লার চান্দিনা, মাধাইয়া ও নিমসার বাজার এলাকাতেও অতিরিক্ত যানচাপের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজধানী থেকে বের হওয়ার প্রধান তিনটি পথ গাবতলী-সাভার, উত্তরা-আবদুল্লাহপুর ও মেয়র হানিফ উড়ালসড়ক নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে মেয়র হানিফ উড়ালসড়কের টোল প্লাজায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্প ও ঢাকা-আশুলিয়া উড়ালসড়কের নির্মাণকাজের কারণে উত্তরা-ময়মনসিংহ রুটে ভোগান্তি বাড়তে পারে।
সম্প্রতি ঢাকা-আরিচা ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল, অনিয়মিত বাস থামানো এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার দৃশ্য দেখা গেছে। এতে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবহন চালকদের মতে, এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ঈদের ঠিক আগে চাপ বাড়বে। তারা মনে করছেন, মহাসড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে পরিচালিত হলে দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ঈদযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ টোল প্লাজা ও যানজটপ্রবণ এলাকায় বিজিবি সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকবেন।
সড়ক ও সেতু বিভাগ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে কার্ডের মাধ্যমে দ্রুত টোল আদায়ের ব্যবস্থা চালু করেছে, যাতে টোল প্লাজায় সময় কম লাগে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক প্রশস্ত হলেও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা হয়ে আছে। বৃষ্টি, দুর্ঘটনা বা নির্মাণকাজের কারণে যেকোনো সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই ঈদের শেষ মুহূর্তে যাত্রীদের ভোগান্তির আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন