ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

জলবায়ু ঝুঁকি বাড়লেও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমছে

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুন ৬, ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমাগত বাড়লেও গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু-সম্পর্কিত বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ পরিস্থিতিতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জলবায়ু-স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা।

শনিবার (০৬ জুন) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), এইচইকেএস/ইপিইআর এবং সুশীলনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন’ শীর্ষক নীতিসংলাপে এ উদ্বেগ তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণা অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মোট বাজেটের মধ্যে জলবায়ু-সম্পর্কিত বরাদ্দ ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশে। একই সময়ে জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশও প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

এসময় স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের গভর্ন্যান্স, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশবিষয়ক সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শিরিন সুলতানা লিরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক তথ্যকে কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। তিনি স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে অধিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সংলাপে সিপিআরডির দুটি গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষণা দুটির শিরোনাম হলো— ‘উপকূলীয় নারী ও কিশোরীদের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন’ এবং ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অর্থায়ন: নীতিগত আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব আর্থিক চিত্র’।

এই গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ুজনিত দারিদ্র্য, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা গুরুতর প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। অংশগ্রহণকারীরা অনিয়মিত ঋতুস্রাব, তীব্র মাসিকব্যথা, গর্ভপাত, প্রি-এক্লাম্পসিয়া, প্রসব-পরবর্তী সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিলের (বিসিসিটিএফ) মোট অর্থায়নের ১ শতাংশেরও কম স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ তহবিলের আওতায় অর্থায়ন পাওয়া ৮৭৭টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র তিনটি বাস্তবায়ন করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) ২০২৩-২০৫০-এ স্বাস্থ্যকে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি। স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) অনুযায়ী, জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে।

গবেষণার বরাত দিয়ে তারা বলেন, জলবায়ু-স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে। বিপরীতে রোগ নজরদারি, জরুরি প্রস্তুতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ু-স্বাস্থ্য গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতা গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো তুলনামূলকভাবে কম অর্থায়ন পাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) উপসচিব ড. শাহ আবদুল সাদি বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন সংগ্রহের জন্য শক্তিশালী জলবায়ু-যুক্তি উপস্থাপন অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক অভিযোজন অর্থায়ন এক বছরে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার কমেছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জলবায়ু বাজেট ট্যাগিং ব্যবস্থাকে আরও সুস্পষ্ট করা এবং খাতভিত্তিক মালিকানা ও সম্পদ সংগ্রহ জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. ইকবাল কবির বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে আসে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের অভাব শক্তিশালী অর্থায়ন প্রস্তাব ও তথ্যনির্ভর নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসময় ইআরডি’র অতিরিক্ত সচিব ও ইউএন উইং প্রধান এ কে এম সোহেল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় পুরোপুরি মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে নানা উদ্যোগ বিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান সম্পদ ও অর্থায়নের সুযোগ সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করার আহ্বান জানান তিনি।

সংলাপের শেষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের জন্য কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় বাজেট প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার অগ্রাধিকারগুলো আরও জোরালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, জলবায়ু বাজেট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা, প্রস্তুতি ও রোগ নজরদারির জন্য নিয়মিত অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য খাতের অভিযোজন উদ্যোগের জন্য দেশীয় জলবায়ু তহবিলে অধিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।