ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ গাঁট তুলা উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০২:১২ এএম
ছবি : সংগৃহীত

তুলার আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় বস্ত্র ও পোশাক শিল্পকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশীয় তুলার আঁশ উৎপাদন ১৯ লাখ গাঁটে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

বর্তমানে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২.২৪ লাখ গাঁট তুলার আঁশ উৎপাদিত হয়, যা দেশের বস্ত্র খাতের মোট চাহিদার মাত্র ১৬-১৭ শতাংশ পূরণ করে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই উৎপাদন ৫ লাখ গাঁটে উন্নীত করার পর ২০৫০ সালে তা ১৯ লাখ গাঁটে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তুলা উন্নয়ন বোর্ড (সিডিবি)-এর উপপরিচালক কুতুব উদ্দিন জানান, হাইব্রিড তুলার জাত উদ্ভাবন, চাষযোগ্য জমির সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের ধারাবাহিক প্রণোদনা সহায়তার মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। তিনি বলেন, উপযুক্ত জমির ব্যবহার ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে দেশে তুলা উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে আমদানিকৃত তুলার ওপর নির্ভরতা কমবে এবং তৈরি পোশাক খাতের সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী হবে।

সিডিবির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে তুলার চাষ হয়। তবে প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমিতে তুলা চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার চরাঞ্চল, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার অনুপযোগী জমিতে তুলা চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছে, যাতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ গাঁট কাঁচা তুলার প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে দেশটি বছরে প্রায় ৭৫-৮০ লাখ গাঁট তুলা আমদানি করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৩ লাখ গাঁট তুলা আমদানি করা হয়েছে, যা দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে।

সিডিবি কর্মকর্তারা জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে তুলার আঁশ উৎপাদন ৫ লাখ গাঁটে উন্নীত করা গেলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে তুলা চাষিদের প্রণোদনা প্রদান, কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনা এবং কার্বন ট্রেডিং উদ্যোগের মাধ্যমে ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণ।

বর্তমানে বিশ্বের তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০তম। অন্যদিকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ব্রাজিল তুলা উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে।

তুলা শুধু বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নয়, এর উপজাতও গুরুত্বপূর্ণ। তুলার বীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদন করা হয় এবং খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা ফসলটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়ায়।

তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সিডিবির উপপরিচালক ড. মো. তাসদিকুর রহমান বলেন, তুলা চাষে দীর্ঘ উৎপাদন সময়, অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, জমির স্বল্পতা, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, মূল্য ওঠানামা এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণ বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারের ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি তুলা উন্নয়ন বোর্ডকে আরও শক্তিশালী করা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব বস্ত্র খাতকে উৎসাহিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তুলা চাষে প্রণোদনা হিসেবে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সিডিবির মৃত্তিকা উর্বরতা ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. এম. গাজী গোলাম মুর্তুজা জানান, ২৬টি জেলার প্রায় ২৫ হাজার প্রান্তিক কৃষককে উন্নত মানের বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করা হবে।

তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষকদের মুনাফা বৃদ্ধি করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য, যাতে তারা আরও বেশি তুলা চাষে আগ্রহী হন।

সিডিবির নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন জানান, এক বিঘা জমিতে তুলা চাষে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়, যেখানে কৃষকরা প্রায় ১৫ মণ কাঁচা তুলা উৎপাদন করে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, দেশীয়ভাবে উৎপাদিত প্রতি কেজি তুলা প্রায় ৪ মার্কিন ডলার আমদানি খরচ সাশ্রয় করে।

সাধারণত জুনের মাঝামাঝি সময়ে তুলার বীজ বপন করা হয় এবং ডিসেম্বর মাসে তা সংগ্রহ করা হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, উন্নত বীজ প্রযুক্তি, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং জিনগতভাবে উন্নত জাতের ব্যবহার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ, পশ্চিম, উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ৩২টিরও বেশি জেলায় উঁচু ও পাহাড়ি এলাকায় তুলা চাষের জন্য অনুকূল পরিবেশ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি সহায়তা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আগামী দশকগুলোতে দেশীয় তুলা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।