খুলনা ওয়াসার ফেজ ২-এর ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের আলোচিত সেই নির্বাহী প্রকৌশলীকে যোগদানপত্রের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নিয়োগের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বিকেলে এ নিয়োগে যোগদানপত্রে স্বাক্ষর করেন খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। এদিকে আওয়ামী ঘরানার বিতর্কিত প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলামকে প্রকল্পের রুটিন দায়িত্ব হিসেবে পিডি নিয়োগ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খুলনার নাগরিক নেতৃবৃন্দ।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে ক্ষোভ জানান তারা।
খুলনা সচেতন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক মোজাহিদুর রহমানের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য দেন: খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আহমেদ হামিম রাহাত, শিক্ষক নেতা মুরাদ সোহাগ, নাগরিক নেতা মিনার মুসফিক, উজ্জ্বল, আবু জার প্রমুখ।
এ সময় নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর মো. রেজাউল ইসলামকে খুলনা ওয়াসার রুটিন পিডি নিয়োগ বাতিল না করলে আগামীতে খুলনার মানুষ পানি বন্ধসহ কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করবে।’
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র-জনতা তথা খুলনার নাগরিক সমাজ সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ করলেও তার কোনো তদন্ত না করে এবং শাস্তির আওতায় না এনে উল্টো আড়াই হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই বিশাল প্রকল্পের পিডি নিয়োগ দিয়ে তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এজন্য বর্তমান ওয়াসা কর্তৃপক্ষ দায়ী।’
নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘খুলনার আলোচিত শেখ বাড়ির এই দোসরকে কত টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা জানতে চায় খুলনার মানুষ।’
নেতৃবৃন্দ জুলাই চেতনাকে সমুন্নত রাখার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘প্রায় দুই হাজার প্রাণের বিনিময়ে ফ্যাসিস্ট বিতাড়িত হয়েছে। জুলাই যোদ্ধারা আমাদের গর্ব। কিন্তু কতিপয় জুলাই যোদ্ধা শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি তদবির করে আওয়ামী ঘরানার এই প্রকৌশলীকে নিয়োগ দিয়েছে। অথচ ওয়াসার বিধি অনুযায়ী তিনি এই নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য নন। আলোচিত প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম অতীতে আইইবি নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু পরিষদের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। প্রচার রয়েছে, কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে তিনি ওই নির্বাচন করেন।’
এদিকে তাকে পিডি হিসেবে রুটিন দায়িত্ব প্রদান করায় খুলনা ওয়াসা ভবনে গুমোট পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) বিকেলে পিডির যোগদানপত্রে স্বাক্ষর করেন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান।
এর আগে বেলা ২টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশের বহিষ্কৃত নেতা তানভীরের নেতৃত্বে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল খুলনা ওয়াসা ভবনে গিয়ে পিডির যোগদানপত্রে স্বাক্ষর করতে চাপ সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ ওঠে।
তারও আগে গত ১১ ডিসেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও বর্তমানে এনসিপি নেত্রী নুসরাত তাবাসসুম ঢাকা থেকে খুলনা ওয়াসা ভবনে আসেন। এ সময় খুলনা ওয়াসার বোর্ড সদস্য ছাত্র প্রতিনিধি ইব্রাহিম খলিল এবং এনসিপি নেতা অহিদুজ্জামান তার সঙ্গে ছিলেন। মাত্র কয়েক মিনিটের সাক্ষাৎ শেষে পিডি নিয়োগের জন্য একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ওই পত্র স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পৌঁছানোর দুই ঘণ্টার মধ্যেই কয়েক কর্মকর্তার হাত ঘুরে স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়।
অথচ গত ৯ নভেম্বর খুলনা ওয়াসার বর্তমান এমডির নিয়োগ হলেও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়পত্র পেতে সময় লাগে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তিনি যোগদান করেন ১০ ডিসেম্বর। একজন এমডির নিয়োগ ও যোগদানে যেখানে এক মাস সময় লাগে, সেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পিডি নিয়োগ হওয়াকে আশ্চর্যজনক বলে মনে করেন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার।
নাগরিক নেতৃবৃন্দের দাবি, নুসরাত তাবাসসুমের প্রভাবেই ফাইল ঝড়ো গতিতে নড়েছে। এ ছাড়া প্রচার রয়েছে, খুলনা ওয়াসার তরুণ এক বোর্ড সদস্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে এই নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমি যোগদানের আগেই মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আমি খুলনা ওয়াসার লোকবল অনুযায়ী চার জনের একটি তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এটি সম্পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বিষয়, আমার ব্যক্তিগত কোনো করণীয় ছিল না।’
দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি সদ্য যোগদান করেছি। বিষয়টি এখনো আমার নজরে আসেনি। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন