ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

খালেদা জিয়া ‘গণতন্ত্রের রাণী’ ও একটি রাজকীয় বিদায়ের গৌরবময় পরিসমাপ্তি 

মো. শাহজাহান মিয়া
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
খালেদা জিয়া। ছবি : সংগৃহীত

পৃথিবীর ইতিহাসে রাজকীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্যের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সবচেয়ে সুমহান ব্যক্তিত্ব যা  রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে রাজতন্ত্রের অবস্হান, যার গোড়াপত্তন হয় আজ থেকে প্রায় ১১০০ বছর আগে। অর্থাৎ ডিউক অব নরম‍্যান্ডি, উইলিয়াম দি কনকোয়ারর (William the Conqueror) ১০৬৬ সালে হেস্টিংস যুদ্ধে (Battle of Hastings) রাজা হ‍্যারল্ড গডউইনসনকে পরাজয়ের মাধ্যমে। সেই অবধি থেকে আজ পর্যন্ত  ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাস এক সম্মোহনী মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যার সর্বশেষ প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের (১৯৫২-২০২২) রাজকীয় বিদায়ের পরিসমাপ্তিতে।

বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে একটি রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে। যার সৃষ্টি ও শুরু হয়েছিল একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। কেননা সেই কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের অকাল প্রয়াণ ঘটে একই শাসন ও শাসকের হাত দিয়ে বাকশালী শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে! পরবর্তী একটি নব্য স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যখন সামরিক বাহিনীর ক‍্যু পাল্টা ক‍্যুর হস্তক্ষেপ শুরু হয়, সেই ধারা বাহিকতার এক পর্যায়ে সিপাহি-জনতার (৭ নভেম্বর ১৯৭৫) অভ‍্যুত্থানের বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে আগমন ঘটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এক উজ্জ্বল সন্ধ্যা তারার মতো। তার রাজনৈতিক নতুন দর্শনে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেন এক মৌলিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ যা আজও ধ্রুব তারার মতোই উজ্জ্বল ও স্থির। যিনি বাংলাদেশকে সামরিক ব‍্যবস্হাকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনেন এবং বহু দলীয় গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন করেন। আর এই উজ্জ্বল রাজনৈতিক মহানায়কের যবনিকাপাত ঘটেছিল ৩০ মে ১৯৮১ সালে এক ব‍্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে।

৩ জানুয়ারি ১৯৮২ সাল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে  আরেকটি ধ্রুব তারার আগমন ঘটে, যে দিন বেগম খালেদা জিয়া দলীয় নেতাকর্মীদের আহ্বানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতিতে যোগ দেন। রাজনীতিতে তার আগমন ছিল এক হেমিলিয়নের বাশিঁওয়ালার মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে স্বৈরাচার এরশাদ যখন ক্ষমতা দখল করেন, তৎপরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের প্রথম প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার প্রথম ধাপ অতিক্রম করেন। সেই নির্বাচন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ সব রাজনৈতিক দল প্রত্যাখ্যান করার কৌশল থাকলেও সেই রাজনৈতিক ওয়াদা ভঙ্গ করে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কৌশল বিজ্ঞানের (Policy Science) দৃষ্টিতে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি উভয়ই বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং কৌশলের কাছে পরাজিত হয়। কারণ এরশাদের কলুষিত এই নির্বাচন তাকে বৈধতার সংকটে ফেলে (Legitimacy Crisis) এবং বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জ্ঞানের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। কেননা স্বৈরাচারবিরোধী সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯০ সালে হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ  ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সুতরাং পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন প্রথম দশকটি একটি সংকটের অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ হলেও সংকটের এই পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন একজন জাতীয়তাবাদী আদর্শের সুযোগ্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি তথা আপসহীন নেত্রী হিসেবে যা তাকে রাজনৈতিক লৌহমানবী হিসেবে পরিচিত করেছে। আর তার এই রাজনৈতিক অবস্থানই তাকে বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯১ সালে তিনি নির্বাচিত হন।

এখানে মূল আলোচনার বিষয়বস্তু হলো বেগম জিয়ার মৌলিক রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে জনমনে তার জনপ্রিয়তা সর্বজনবিদিত হওয়ার কারণ ও প্রাসঙ্গিক দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করা।

প্রথমত, যদিও জিয়াউর রহমান মৌলিক রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠিত করেছেন কিন্তু তার এই রাজনৈতিক দর্শনই বেগম জিয়া তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। রাজনীতি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটাকে বলা হয় সফল রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ (Successful Political Penetration)। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯০ সালের দিকে তার একটি বিখ্যাত উক্তির কথা উল্লেখ করা যায়, তা হলো ‘আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা, অন‍্যদের হাতে গোলামির জিঞ্জির’।

তাছাড়া বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হলেও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনগণও একসাথে শান্তিতে বসবাসের সংস্কৃতি আমাদের বহুপুরানো। এক্ষেত্রে তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্যের সংস্কৃতি সৃষ্টি করেননি। যার কারণে অন‍্যান‍্য ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তার পরোক্ষ সমর্থন ছিল। অর্থাৎ ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে রাজনীতিতে তিনি সার্বজনীন ব‍্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক আপসহীনতা ছিল বেগম জিয়ার রাজনৈতিক চরিত্রের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে ১/১১ সরকারের আমলে তিনি কোন রাজনৈতিক আপসহীনতার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে চাননি! কিন্তু তার বিপরীত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা রাজনীতিতে আপস করেছেন, ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্রকে হত্যা করে আজ তারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের কালো অধ্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তৃতীয়ত, বেগম জিয়ার কিছু রাজনৈতিক স্লোগানের   দায়বদ্ধতা বাংলাদেশের জনগণের কাছে বিটিভির মা, মাটি ও মানুষের অনুষ্ঠানের মতো গ্রহণযোগ্য হিসেবে আজও অম্লান। এখানে মা বলতে তিনি জনগণের প্রতি তার ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা এবং কর্তব্যবোধকে বুঝিয়েছেন, মাটি বলতে তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে ইঙ্গিত করেছেন এবং মানুষ বলতে জনগণের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতিক হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন। মোদ্দা কথা হলো তার রাজনৈতিক দর্শনের মূলে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিতের মাধ্যমে তাদের আস্থা অর্জন করা। তার সূদুরপ্রসারি হিসেবে পরবর্তীতে দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও স্লোগানের বাস্তবতা আজও উপলব্ধি করা হয়। তারই আপডেটেড স্লোগান হিসেবে তার সুযোগ্য সন্তান হিসেবে তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশে সাড়া ফেলেছে।

চতুর্থত, স্বৈরাচারবিরোধী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জনপ্রিয়তা, সংসদীয় শাসন ব্যবস্থার পুনপ্রবর্তন, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক কালো অধ্যায়ের (২০১৪-২০২৪) বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদও বিসর্জনের মাধ্যমে জনগণের কাছে তিনি গভীর জনপ্রিয়তা ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে হারিয়েছেন, তার বড় ছেলে তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত রাজনৈতিক জীবন পার করেছেন তবুও রাজনৈতিক নির্যাতনের উপায়ের জন্য কোনো আপস করেননি। তিনি সবসময় বলেছেন দেশের বাহিরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, বাংলাদেশই আমার ঠিকানা এবং এদেশেই আমি মৃত্যুবরণ করব। মূলত তিনি তার রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে নিজেকে বিচ‍্যুত করেননি।

পঞ্চমত, রাজনৈতিক শ্রদ্ধা ও সমালোচনার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট সজাগ ছিলেন। বিশেষ করে ৫ আগস্ট ২০২৪ স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ নয়, পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে আমরা সকলে মিলে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেকে সত‍্যিকার অর্থে একটি বাসযোগ্য ও উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাই। তিনি ৫ আগস্টের পূর্ববর্তী বিভিন্ন  বক্তৃতায় বলেছেন আমাকে জেল ও নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে লাভ নাই, আমি জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার অধিকার থেকে পিছপা হবো না। তাছাড়া বিশ্ব মঞ্চে বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বাংলাদেশকে যখন গর্বিত করেছেন তার প্রতিক্রিয়ায় বেগম জিয়া যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ করেছেন। অথচ তার বিপরীতে শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুঃখজনক! 

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, শেখ হাসিনার এত নির্যাতন ও অনিয়মের পরও অর্থাৎ ৫ আগস্টের পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া কখনও শেখ হাসিনাকে সম্মানহানি করে কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা দেননি। সুতরাং রাজনীতিতে তার এই উদারতা তাকে বাংলাদেশের জনগণের কাছে দীর্ঘ মেয়াদী ও গ্রহণযোগ্য রাণীর মতো গভীর শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ষষ্ঠত, কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেগম জিয়ার দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যৌথ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করতেন। যা ছিল ভারতের মতো আধিপত্যবাদ ও কৌটিল্য নীতির দ্বিপাক্ষিক কৌশল মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে করে তিনি ভারতকে যৌথ প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত রাখতেন। পাশাপাশি দক্ষিণ এশীয়ার অন্যান্য দেশের কাছে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতাও অস্তিত্বমান রেখেছেন। তাছাড়া তিনি মুসলিম বিশ্বের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজর দিয়েছিলেন যা ছিল জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি। এমনকি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় পূর্ব ও পশ্চিমের বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সাথেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি প্রসারিত করেছিলেন। 

সপ্তমত, রাজনৈতিক নীতির আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে বেগম জিয়া এক অনন্য দৃষ্টান্ত! সম্প্রতি লন্ডনে বিএনপি কর্তৃক আয়োজিত বাংলাদেশের ৫৫ তম বিজয় দিবসের আলোচনায় জনাব তারেক রহমান একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। আর তা হলো, লন্ডন ক্লিনিকে বেগম জিয়া যখন চিকিৎসাধীন ছিলেন তখন এক নাইজেরিয়ান নার্স বেগম জিয়ার একটি অবদানের কথা স্মরণ করেন। তখন উপস্থিত সবাই নার্সের কাছে জানতে চেয়েছিলেন বিষয়টি সম্পর্কে। তখন নার্স বলেন বেগম খালেদা জিয়াকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার পরিচয় আমরা জানি! কিন্তু তার বাহিরেও তার অন‍্য একটি পরিচয় আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে! আর তা হলো, বাংলাদেশে বেগম জিয়া যখন মেয়েদের অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাবৃত্তি চালু করেন তখন নাইজেরিয়াতে তার ব‍্যাপক প্রভাব পড়ে। পরবর্তীতে নাইজেরিয়ান সরকারও সেই দেশে মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও বৃত্তি চালু করেন। ফলে, এই সুবিধার কারণে আমার শিক্ষা জীবন শেষ করতে পেরেছি এবং আমি আজ সৌভাগ্যবান যে আমি সেই প্রধানমন্ত্রীর সেবা করার সুযোগ পেয়েছি! সুতরাং তা থেকে দেখা বেগম জিয়ার সৃজনশীল নীতি (Creative Policy) এশিয়া থেকে আফ্রিকায় অনুপ্রেরণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও সম্মানিত করেছে।

এবার আসা যাক তার রাজনৈতিক জীবনের খ‍্যাতি ও ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ইতিহাস মূল্যায়নের দিক বিশ্লেষণ করি। আমরা ইতোমধ্যে বেগম জিয়াকে দেশনেত্রী কিংবা আপোষহীন নেত্রী হিসেবে পরিচয় পেয়েছি। শেখ হাসিনার সরকার যখন তাকে একটা আবদ্ধ শাস্তির (Confine Punishment) মধ্যে ফেলে দিয়েছে তখনও তিনি গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে সরে আসেননি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে Canadian Human Rights International Organisation (CHRIO), ‘Democracy and Its Protection’ এর জন্য ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই ‘Mother of Democracy’ উপাধিতে সম্মানিত করেছে (৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, দি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। যদিও ২৫ মে ২০১৪ সালে আমার দেশ পত্রিকায় সর্বপ্রথম, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জনাব রাকেশ রহমান বেগম জিয়াকে ‘Mother of Democracy’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এ ছাড়া নারীর ক্ষমতায়নের (Woman Empowerment) জন্য তিনি বাংলাদেশের আইকনিক নেত্রীতে পরিণত হয়েছেন।

সুতরাং উপরিউক্ত বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বোঝা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের জাতীয় প্রতীক ও প্রতিরোধের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, এবং গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হবে। যা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের জণগণের প্রতি গভীর অনুপ্রাণিত আনুগত্য ও রাজকীয় দায়বদ্ধতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। যদিও বেগম জিয়া গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেত্রী কিন্তু ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের মতো উত্তরাধিকার সূত্রে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না। তাই বেগম খালেদা জিয়ার সম্মোহনি নেতৃত্ব (Charismatic Leadership) বিশ্লেষণে আমরা তার মধ্যে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের জণগনের প্রতি যে রাজকীয় দায়বদ্ধতা, জনপ্রিয়তা ও শ্রদ্ধাবোধ তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা তার রাজকীয় বিদায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। সেই জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা তাকে ‘গণতন্ত্রের রাণী’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। এ ছাড়া তার নামের ‘বেগম’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ বিশ্লেষণেও তাকে রাণীর আসনে ভূষিত করা যায়!

মোদ্দাকথা, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম জিয়ার নেতৃত্ব ও তার প্রভাব এতটাই গভীর ও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ যে, তিনি দেশের রাজনৈতিক আখ‍্যানের একজন প্রধান কিংবা রাজকীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। যাকে আমরা দীর্ঘকাল ধরে একজন শাসনকারী রাজা/রাণীর স্হায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত ব‍্যবস্হার সাথে তুলনা করতে পারি। যা তাকে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানের উপস্থিতি হিসেবে মূল‍্যায়িত করবে। 


লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক জাতীয় বিতার্কিক