× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২৬, ১১:৪৩ পিএম

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে পারস্পরিক সহযোগিতার বিকল্প নেই

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২৬, ১১:৪৩ পিএম

ছবি-সংগৃহীত

ছবি-সংগৃহীত

গণতন্ত্রের প্রাণ হলো নির্বাচন। আর সেই নির্বাচন যদি অবাধ ও সুষ্ঠু না হয়, তবে গণতন্ত্র কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—এই সব পক্ষের সম্মিলিত ভূমিকার ওপরই নির্ভর করে একটি নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। বাস্তবতা হলো, একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পারস্পরিক সহযোগিতাই এখানে একমাত্র কার্যকর উপায়।

বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রেক্ষাপট জটিল ও বহুমাত্রিক। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বিভিন্ন রাজনৈতিক পর্ব অতিক্রম করেছে। কখনো সামরিক শাসন, কখনো একদলীয় প্রবণতা, কখনো তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ—সব মিলিয়ে নির্বাচন প্রশ্নে বারবার আস্থার সংকট প্রকট হয়েছে। বিশেষ করে বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্ক, অভিযোগ ও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, নির্বাচন শুধু ভোটের দিনের ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যার শুরু রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে এবং শেষ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আচরণে।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলতে সাধারণত তিনটি মৌলিক বিষয়কে বোঝানো হয়। প্রথমত, ভোটার যেন ভয়ভীতি বা প্রলোভন ছাড়া স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থী যেন সমান সুযোগ পান। তৃতীয়ত, ভোট গণনা ও ফলাফল ঘোষণায় স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা। এই তিনটি শর্ত পূরণে কেবল নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া কোনো কমিশনের পক্ষেই সফল হওয়া সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক দলগুলোই নির্বাচনের প্রধান অংশীজন। তাদের আচরণই নির্বাচনী পরিবেশ নির্ধারণ করে। যদি কোনো বড় রাজনৈতিক দল প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, কিংবা কোনো দল আগেভাগেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সহিংস কর্মসূচিতে যায়, তবে সেই নির্বাচন কখনোই সুষ্ঠু হতে পারে না। তাই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম আস্থা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা গড়ে তোলা জরুরি। মতবিরোধ থাকবে, সমালোচনা থাকবে; কিন্তু তা যেন সহিংসতা বা অচলাবস্থায় রূপ না নেয়।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। তবে বাস্তবে এই স্বাধীনতা কার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক সমর্থন এবং প্রশাসনিক সহযোগিতা অপরিহার্য। কমিশন যদি দৃঢ়ভাবে আইন প্রয়োগ করতে চায়, কিন্তু মাঠ প্রশাসন সহযোগিতা না করে, তাহলে কমিশন কার্যত কাগুজে বাঘে পরিণত হয়। আবার কমিশনের ওপর রাজনৈতিক চাপ থাকলে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই কমিশনের কর্তৃত্ব সবাইকে মেনে নিতে হবে এবং একটি সহযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা অবাধ নির্বাচনের অন্যতম শর্ত। ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা, ভোটারদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং সহিংসতা প্রতিরোধ করা তাদের প্রধান দায়িত্ব। অতীতে প্রশাসনের একটি অংশের পক্ষপাতমূলক আচরণ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই প্রশাসনের ভেতরে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রশাসনকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

বিচার বিভাগের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধ, আচরণবিধি লঙ্ঘন, সহিংসতা বা অনিয়মের অভিযোগ দ্রুত ও ন্যায্যভাবে নিষ্পত্তি না হলে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়। একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগই পারে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে। এজন্য নির্বাচনকালীন আইনি কাঠামোকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করা প্রয়োজন।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনকালে তারা বেসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে পারে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগে সহায়তাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা জনমনে আস্থা বাড়ায় এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা দৃঢ় করে।

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ নির্বাচনের অদৃশ্য প্রহরী। স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম নির্বাচনসংক্রান্ত অনিয়ম, সহিংসতা ও পক্ষপাতের চিত্র জনসম্মুখে তুলে ধরতে পারে। তবে দায়িত্বশীলতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুজব, অতিরঞ্জন বা পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। নাগরিক সমাজ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদেরও তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ থাকতে হবে; নতুবা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতা বাংলাদেশের আরেকটি বড় সমস্যা। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সহিংসতা, ভোটের দিন কেন্দ্র দখল কিংবা ফল ঘোষণার পর সংঘর্ষ—এসব ঘটনা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সহিংসতা কোনো পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নয়। বরং এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে সহিংসতার পথ পরিহার করে সংলাপ ও আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

ভোটারদের ভূমিকার কথাও ভুলে গেলে চলবে না। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্বও। ভোটাররা যদি ভয় বা লোভের কাছে নতি স্বীকার করেন কিংবা ভোট দিতে অনাগ্রহী হন, তবে নির্বাচন দুর্বল হয়ে পড়ে। সচেতন ও সাহসী ভোটারই পারে অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে।

প্রযুক্তির ব্যবহার নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ করতে পারে, তবে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ না হলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। ফলাফল ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার বা ডিজিটাল ভোটার তালিকা—সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রযুক্তি যেন কোনো পক্ষের কাছে সন্দেহের কারণ না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিও বাংলাদেশের নির্বাচনের ওপর নিবদ্ধ থাকে। বিদেশি পর্যবেক্ষক ও উন্নয়ন সহযোগীরা নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে। তবে নির্বাচন কোনো বিদেশি চাপের কারণে নয়; বরং দেশের জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হলে দেশের ভেতরেই সহযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কোনো একদিনের আয়োজন নয়। এটি একটি ধারাবাহিক ও সম্মিলিত প্রক্রিয়া। রাজনৈতিক দলগুলোকে সংযম ও দায়িত্বশীলতা দেখাতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে হতে হবে দৃঢ় ও নিরপেক্ষ। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আর ভোটারদের হতে হবে সচেতন ও সাহসী। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থেই একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে এগোতে চায়, তবে পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা
[email protected] 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!