বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি। মবতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বহুমুখী চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছে প্রশাসন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসন একধরনের অদৃশ্য অথচ প্রচণ্ড চাপের মধ্যে কাজ করছে।
এই চাপ শুধু রাজনৈতিক নয় বরং এটি নৈতিক ও অনৈতিক—উভয় ধরনের। একদিকে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার দায়িত্ব। অন্যদিকে ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর প্রত্যাশা, হুমকি ও শক্তি প্রদর্শন। এই দ্বন্দ্বই আজ প্রশাসনকে কার্যত অসহায় করে তুলছে।
মবতন্ত্র বলতে আমরা সাধারণত রাস্তায় ভাঙচুর, সংঘর্ষ বা বিক্ষোভকে বুঝি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মবতন্ত্র তার চেয়েও গভীর এবং ভয়ংকর একটি মানসিকতা। এটি এমন একটি প্রবণতা, যেখানে আইনকে পাশ কাটিয়ে সংখ্যার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। যেখানে প্রতিষ্ঠানকে সম্মান না করে তাকে ভয় দেখানো হয়। যেখানে সংলাপের বদলে হইচই এবং যুক্তির বদলে লাঠি কথা বলে। এই মানসিকতা যখন রাজনীতির কেন্দ্রে স্থান পায়, তখন প্রশাসন কার্যত দুই আগুনের মাঝখানে পড়ে যায়। যা একটি সমাজের গভীর অবক্ষয়ের ভয়ংকর ইঙ্গিত।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই বাস্তবতাকেই বারবার আমাদের সামনে নিয়ে আসছে। অতি সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে অপ্রত্যাশিত বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতি, পরদিন আবার কমিশন ঘেরাও—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই রাজনৈতিক চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। নিয়মিত গায়ের শক্তি প্রদর্শন, হুমকি আর পাল্টা হুমকির রাজনীতি প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে মাঠ প্রশাসনের অবস্থা আরও করুণ। একজন ইউএনও, একজন ডিসি বা একজন রিটার্নিং অফিসার আজ আর কেবল আইন অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না। বরং তিনি হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক চাপের লক্ষ্যবস্তু। কোনো সিদ্ধান্ত নিলে এক পক্ষ অসন্তুষ্ট। সিদ্ধান্ত না নিলে আরেক পক্ষ ক্ষুব্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্র হনন, ব্যক্তিগত আক্রমণ, পরিবারকে জড়িয়ে হুমকি। এসব এখন নিত্যদিনের ঘটনা। ফলাফল হিসেবে জন্ম নিচ্ছে ‘ঝুঁকি এড়ানোর প্রশাসন’, যেখানে সাহসী সিদ্ধান্তের বদলে দেখা যায় সময়ক্ষেপণ ও নীরবতা। এতে ভয়ানক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
নোয়াখালীতে সম্প্রতি একজন যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আমাদেরকে আবারো সেই নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মব সৃষ্টির নামে সংঘবদ্ধ সহিংসতা যখন প্রাণ কেড়ে নেয়, তখন সেটি কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ থাকে না বরং তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বহীনতার প্রতীক। কারণ, সহিংসতা তখনই বাড়ে, যখন অপরাধীরা ধরে নেয় যে, আইন হয়তো তাদের ছুঁতে পারবে না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, “Violence can destroy power; it is utterly incapable of creating it.” অর্থাৎ সহিংসতা ক্ষমতাকে ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু কখনো প্রকৃত ক্ষমতা সৃষ্টি করতে পারে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই কথার তাৎপর্য অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। মবতন্ত্র সাময়িকভাবে ফল এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
ম্যাক্স ওয়েবারের রাষ্ট্রতত্ত্ব আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তার ভাষায়, “The state is a human community that successfully claims the monopoly of the legitimate use of physical force.” অর্থাৎ রাষ্ট্র হলো সেই মানবসমাজ, যা বৈধ বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার ধরে রাখে। যখন এই বৈধতার সীমা লঙ্ঘিত হয় এবং অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, তখন প্রশাসন স্বাভাবিকভাবেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
নির্বাচনকালীন চাপ প্রশাসনের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। একদিকে আচরণবিধি, আইনশৃঙ্খলা ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব; অন্যদিকে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর অবিরাম চাপ—কারও পক্ষে নরম হওয়া, কারও বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার দাবি। অনেক ক্ষেত্রে এই চাপ সরাসরি অনৈতিক। কারণ পোস্টিং ও বদলির হুমকি, মামলা-মোকদ্দমার ভয়, কিংবা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা এই ধরনের পরিস্থিতিকে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখেছেন। তিনি বলেন, “Weak states are not those that do too little, but those that do things badly.” অর্থাৎ দুর্বল রাষ্ট্র তারা নয় যারা কম কাজ করে, বরং তারা যারা কাজ করে ভুলভাবে। আমাদের ক্ষেত্রে আইন ও প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু প্রয়োগে ধারাবাহিকতা নেই। এই ফাঁকেই মবতন্ত্র শক্তি সঞ্চয় করে।
প্রশাসনের ওপর অনৈতিক চাপের আরেকটি দিক হলো রাজনৈতিক আনুগত্যের সংস্কৃতি। যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার বদলে পক্ষপাতকে পুরস্কৃত করা হলে প্রশাসনের ভেতরেই বিভাজন তৈরি হয়। কেউ নীতিতে অটল থাকেন, কেউ আপস করেন। এই বিভাজন প্রশাসনিক মনোবল ও কার্যকারিতা দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সামুয়েল পি. হান্টিংটন তার বিখ্যাত বিশ্লেষণে সতর্ক করেছিলেন এই বলে যে, “Political decay occurs when institutions fail to keep pace with social mobilization.” অর্থাৎ সমাজ দ্রুত রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হলে কিন্তু প্রতিষ্ঠান সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে রাজনৈতিক ক্ষয় শুরু হয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সক্রিয়তা বেড়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার সেই হারে এগোয়নি—ফলশ্রুতিতে দেখা দিচ্ছে সংঘাত ও অস্থিরতা।
এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব, তবে তার জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট অবস্থান। প্রথমত, মবতন্ত্রের বিরুদ্ধে দল মত নির্বিশেষে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। মবতন্ত্র কোনো একটি দলের সমস্যা নয়। এটি সমগ্র রাষ্ট্রের জন্য হুমকি। আজ যদি শক্তি প্রদর্শনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কাল সেই অস্ত্রই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। ইতিহাসের শিক্ষা তাই বলে।
গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় নিয়মে। শালীনতায় ও দায়িত্বশীল আচরণে। প্রশাসন শক্তিশালী হয় নৈতিক সাহসে, ভয়ের কাছে নতিস্বীকারে নয়। সুতরাং মবতন্ত্র ও অনৈতিক চাপের এই যুগল সংকট থেকে সহসা বেরিয়ে আসতে না পারলে আমরা কেবল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই নয় বরং অবধারিতভাবে হুমকির মুখে পড়বে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন