প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মনোনয়নপত্র যাচাই, আপিল ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে এখন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকা স্পষ্ট।
এই স্পষ্টতাই নির্বাচনি মাঠে ফিরিয়ে এনেছে প্রাণচাঞ্চল্য, প্রতিযোগিতা ও উৎসবের আবহ। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রে এখন প্রার্থী, প্রতীক ও সম্ভাব্য ফলাফল। বহুদিন পর একটি বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন দেখতে যাচ্ছে দেশ, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আশাবাদ সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে তিন শতাধিক প্রার্থী সরে দাঁড়ানোর পর চূড়ান্তভাবে প্রায় এক হাজার ৯৬৭ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে রয়েছেন। এই সংখ্যাই প্রমাণ করে যে, নির্বাচনটি একতরফা নয়; বরং বহুদলীয় ও বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বড় দল, মাঝারি দল, ছোট দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী—সব মিলিয়ে একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ নির্বাচনি চিত্র ফুটে উঠেছে।
দলভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২৯০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। দলটির শরিক ও যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদারদের জন্য কয়েকটি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, আবার কিছু আসনে শরিক দলগুলো নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২১৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং শরিকদের জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন ছেড়ে দিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে ২৫৯টি আসনে প্রার্থী দিয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
জাতীয় পার্টি (জাপা) ১৯৬টি আসনে, গণঅধিকার পরিষদ ৯২টি আসনে এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রায় ৩০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর বাইরে তিন শতাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে রয়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বড় দলের বিদ্রোহী প্রার্থীও আছেন। এই স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি নির্বাচনকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৬০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৪৯টি দল এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে ভোটারদের মধ্যে যে অনীহা ও হতাশা তৈরি হয়েছিল, বহুদলীয় অংশগ্রহণ সেই হতাশা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না—এটি একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা। তবুও মাঠে যে সংখ্যক দল ও প্রার্থী সক্রিয় রয়েছে, তা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক পরিসর একেবারে শূন্য নয়; বরং নতুন ও পুরোনো শক্তির সমন্বয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক বিন্যাসের ইঙ্গিত মিলছে।
প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচার। প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর প্রার্থীরা গ্রামগঞ্জে ছুটছেন, ভোটারদের সঙ্গে দেখা করছেন, মতবিনিময় করছেন। দীর্ঘদিন পর ভোটাররা আবার প্রার্থীদের কাছ থেকে সরাসরি কথা শোনার সুযোগ পাচ্ছেন। এই সরাসরি যোগাযোগই নির্বাচনের প্রাণ। দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার, মাইকিং, পথসভা, জনসভা—সব মিলিয়ে একটি গণতান্ত্রিক উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে।
এই নির্বাচনের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো—প্রবাসী ভোটার ও বিশেষ শ্রেণির ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা। অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক নাগরিক এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন। এটি নির্বাচন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এই নির্বাচনের একটি বড় আলোচ্য বিষয়। প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের জন্য ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্রে ৯ লক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত উপস্থিতি ভোটারদের আস্থার জায়গা শক্ত করতে পারে—যদি এই বাহিনীগুলো নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা পালন করে। ভোটারদের মনে যদি নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়, তাহলে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি বাড়বে, অংশগ্রহণ বাড়বে, আর তাতেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হবে।
অবশ্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিদ্রোহী প্রার্থী, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অতীতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রতিযোগিতা থাকাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন নিয়মের ভেতরে থাকে, সহিংসতার বদলে যুক্তি ও জনসমর্থনের লড়াই হয়, তখন নির্বাচন সত্যিকার অর্থেই উৎসবে পরিণত হয়।
প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখাই এখন মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর। আচরণবিধি মেনে চলা, সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং ভোটারদের স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ তৈরি করাই হবে এই নির্বাচনের সাফল্যের মাপকাঠি। জনগণ চায় একটি শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলে এই নির্বাচন কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবেই নয়, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবেও ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।
প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ায় যে উৎসবমুখর আবহ সৃষ্টি হয়েছে, তা যেন শেষ পর্যন্ত একটি গ্রহণযোগ্য ফলাফলের মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পায়—এটাই আজ জাতির সামষ্টিক কামনা।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন