× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম

নির্বাচনি উত্তাপ: ফ্যাসিস্টদের ফেরার পথ সুগম হচ্ছে না তো?

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম

এ এইচ এম ফারুক। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

এ এইচ এম ফারুক। ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন সূর্যোদয় বা অস্তিত্ব রক্ষার অগ্নিপরীক্ষার দিন। দীর্ঘ ১৫ বছরের জগদ্দল একদলীয় শাসনের অবসান ঘটাতে রাজপথে শত শত তরুণ আর সাধারণ মানুষের যে রক্ত ঝরেছে, সেই মহান ত্যাগের বিনিময়ে দেশ আজ একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—আমরা কি আসলেই ফ্যাসিবাদমুক্ত হতে পেরেছি? ফ্যাসিবাদ কেবল একটি বিশেষ শাসনকাল বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম নয়; এটি একটি গভীর ও বিস্তৃত মনস্তত্ত্ব, যা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে মানুষের চিন্তা ও আচরণে বেশি প্রভাব ফেলে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্তমান নির্বাচনী প্রচারণার ডামাডোলে আমরা লক্ষ্য করছি সেই পুরনো আধিপত্যবাদী আচরণেরই নির্লজ্জ প্রতিফলন। ‘মুখে হাদি অন্তরে হাসিনা’ কিংবা ‘বগলে ইট, মুখে শেখ ফরিদ’—এই যে সুবিধাবাদী ও দ্বিমুখী মানসিকতা, তা বর্তমান বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশেও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে তাড়া করে ফিরছে।

বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির মধ্যে যদি আদর্শিক দৃঢ়তা এবং নৈতিক উচ্চতার ঘাটতি থেকে যায়, তবে কেবল একটি ব্যালট যুদ্ধের মাধ্যমে এই বিশাল পরিবর্তনকে স্থায়ী করা সম্ভব নয়। বরং ফ্যাসিবাদবিরোধীদের নিজেদের মধ্যে অনৈক্য, পারস্পরিক ঘৃণা আর আক্রোশের রাজনীতি প্রকারান্তরে সেই পতিত শক্তির প্রত্যাবর্তনকেই সহস্র গুণ সুগম করে তুলতে পারে। ফ্যাসিবাদের ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার এই চূড়ান্তলগ্নে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।

ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, মাঠপর্যায়ে নির্বাচনী উত্তাপের পাশাপাশি সহিংসতার খবরও গণমাধ্যমে প্রাধান্য পাচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ক্যাম্প ভাঙচুর এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতা কেবল নির্বাচনী উন্মাদনা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর একটি বড় আঘাত। একটি কুচক্রী মহল সুপরিকল্পিতভাবে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছে যাতে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় এবং সাধারণ ভোটারের মনে ভীতি সঞ্চার করা যায়।

আমাদের মনে রাখা উচিত, ফ্যাসিস্টদের পতন ঘটলেও তাদের দোসররা এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে আছে। তারাই আজ ছদ্মবেশে এই সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।

নির্বাচনী জনসভাগুলোতে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে যে ধরণের ব্যক্তিগত আক্রমণ ও উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে, তা আধুনিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। আমরা লক্ষ্য করছি যে, প্রার্থীরা একে অপরকে ঘায়েল করতে গিয়ে এমন সব শব্দ বা হুমকি দিচ্ছেন যা কেবল ফ্যাসিবাদী শাসনামলের সঙ্গেই মানানসই। এই ধরণের 'আক্রোশমূলক বক্তৃতা' সাধারণ কর্মীদের মধ্যে উত্তজনা ছড়িয়ে দেয়, যার চূড়ান্ত ফল হলো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। অধিকাংশ রাজনৈতিক গবেষক মনে করেন— যখনই কোনো আন্দোলনের পর গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঘটে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যে সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখানো উচিত। কিন্তু বর্তমান নির্বাচনী মাঠে নেতাদের সেই 'সীমারেখা' (Limit) লঙ্ঘনের প্রবণতা আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে।

দীর্ঘ বছরের নানামুখী আন্দোলনের সময় যে রাজনৈতিক দলগুলো এক কাতারে দাঁড়িয়ে ফ্যাসিবাদের পতন নিশ্চিত করেছিল, আজ নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে গিয়ে তারা একে অপরের প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এই বিভাজনই হলো ফ্যাসিস্টদের ফিরে আসার সবচেয়ে বড় সুড়ঙ্গ। নির্বাচনের মাঠে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যখন মরণপণ লড়াইয়ে রূপ নেয়, তখন তা তৃতীয় কোনো শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়তা করে। রাজপথের আন্দোলনের ঐক্য যদি ব্যালটের লড়াইয়ে এসে শত্রুতা ও খুনোখুনিতে রূপ নেয়, তবে তা হবে গণঅভ্যুত্থানের মহান শহীদদের রক্তের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান শর্ত হলো স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা। কিন্তু বর্তমান সময়ে মাঠপর্যায়ে পুলিশের নিস্ক্রিয়তা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচনী ময়দানে পেশিশক্তির ব্যবহার যদি বন্ধ করা না যায়, তবে সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহ হারাবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে মনে রাখতে হবে, তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ কেবল ভোট গ্রহণ করা নয়, বরং একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। যদি নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারা একেই পুঁজি করে বলবে যে—গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দেশ চলতে সক্ষম নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে সমতলের প্রান্তিক এলাকাগুলোতেও নির্বাচনী সহিংসতার ছোঁয়া লেগেছে। আমরা লক্ষ্য করছি যে, বিশেষ কিছু গোষ্ঠী ব্যক্তিগত বা ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতাকে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। খাগড়াছড়ি বা রাঙ্গামাটির মতো এলাকায় ব্যক্তিগত বিবাদকে 'পাহাড়ি-বাঙালি' দাঙ্গা বানানোর অপচেষ্টা এই নির্বাচনী অস্থিরতারই একটি বর্ধিত রূপ। এই ধরণের স্পর্শকাতর সময়ে ভুল তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে যারা দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা করছে, তাদের কঠোর হাতে দমন করা রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমান দায়িত্ব।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা কেবল রাজপথের নয়, এটি মনস্তাত্ত্বিক। ১৫ বছরের শাসনামলে আমাদের রাজনৈতিক ডিএনএ-তে যে অসহিষ্ণুতা এবং আধিপত্যবাদের বীজ বপন করা হয়েছে, তা উপড়ে ফেলা সহজ নয়। যদি নতুন বাংলাদেশেও এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দমন করে শাসন করতে চায়, তবে তা হবে কেবল মুখ পরিবর্তন, ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন নয়। নেতাদের মনে রাখতে হবে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল একটি ক্ষমতা বদলের পালা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের পরীক্ষা।

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য কেবল ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা যথেষ্ট নয়, বরং পুরো নির্বাচনী অঞ্চলের মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন ফ্যাসিবাদের অবশেষগুলো মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তখন আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখাও এখন সময়ের দাবি।

নির্বাচনী মাঠে যখন পেশিশক্তির মহড়া চলে এবং সাধারণ ভোটাররা শঙ্কিত থাকে, তখন সেনাবাহিনী মোতায়েন জনমনে আস্থার সঞ্চার করে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো দুর্গম ও সংবেদনশীল অঞ্চলে, যেখানে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা রয়েছে, সেখানে সেনাবাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন প্রায় অসম্ভব। 'ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার'-এর আওতায় সেনাসদস্যরা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করলে দুর্বৃত্তরা সহিংসতা সৃষ্টির সাহস পাবে না।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা যায়, ভোটের দিনের চেয়েও ভোট-পরবর্তী সহিংসতা অনেক সময় ভয়াবহ রূপ নেয়। পরাজিত বা বিজয়ী পক্ষের উগ্র কর্মী-সমর্থকরা অনেক সময় ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হয়। খাগড়াছড়ি বা রাঙ্গামাটির মতো এলাকায় ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে যে 'সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা' বাঁধানোর নীল নকশা করা হচ্ছে, তা রুখতে নির্বাচনের পর অন্তত ১৫ দিন পর্যন্ত সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর কঠোর টহল বজায় রাখা জরুরি।

মাঠপর্যায়ে যেমন সেনা মোতায়েন প্রয়োজন, তেমনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গুজব ছড়ানো কুচক্রী মহলকে শনাক্ত করতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় জোরদার করতে হবে। ভুল তথ্য ছড়িয়ে পাহাড়ে বা সমতলে যেন কেউ কৃত্রিম দাঙ্গা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য দ্রুত তথ্য যাচাই (Fact Check) এবং অপরাধীদের তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

নির্বাচনের আগেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের প্রতিটি চিহ্নিত 'হটস্পটে' সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা জরুরী। পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর হাতে থাকা অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র নির্বাচনের পরিবেশকে যেকোনো সময় বিষিয়ে তুলতে পারে। তাই এই অস্ত্রগুলো নিষ্ক্রিয় করা ছাড়া 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য এই নির্বাচন একটি এসিড টেস্ট। যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, তবে ফ্যাসিস্টরা বিশ্বদরবারে প্রচার করবে যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ পরিচালনায় বর্তমান ব্যবস্থা ব্যর্থ। এই অপবাদ ঘুচাতে এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীকে কার্যকর ক্ষমতা প্রদান করে নির্বাচনী ময়দানকে কলুষমুক্ত রাখা এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

পরিশেষে বলা যায়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়-পরাজয় বড় কথা নয়, বড় কথা হলো গণতন্ত্রের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখা। ফ্যাসিস্টবিরোধী সকল শক্তিকে আজ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যে, তারা নির্বাচনী লড়াইয়ে লিপ্ত হলেও জাতীয় স্বার্থে তারা এক এবং অভিন্ন। ক্ষমতার লোভে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করে ফ্যাসিস্টদের ফিরে আসার পথ যেন কেউ সুগম না করি। নেতাদের বক্তব্যে শালীনতা, কর্মীদের আচরণে সংযম এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারলেই আমরা একটি সার্থক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। নতুবা, ইতিহাসে আমাদের দায় থেকে যাবে যে—আমরা বিপ্লব করতে জানলেও তা রক্ষা করতে শিখিনি।

ফ্যাসিবাদ বিরোধী শক্তির মধ্যে যদি ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্যে ঘাটতি’ এবং আদর্শিক ও নৈতিক ঘাটতি থেকে যায়, তবে ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Link copied!