× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এ এইচ এম ফারুক সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

নির্বাচনে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার পেশাদারিত্বে নতুন বার্তা

এ এইচ এম ফারুক সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি ভোট প্রদানের উৎসব ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর 'শুদ্ধিকরণ' ও পেশাদারিত্বের এক অগ্নিপরীক্ষা ছিল। এই নির্বাচন ছিল প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব প্রমাণের এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।

বিগত দেড় দশকের হাসিনা রেজিমে রাষ্ট্র চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। তখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ওপর চলেছে অতি-রাজনৈতিকীকরণ। জনগণের মনে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জন্মেছিল অনাস্থা। সেই অনাস্থা ডিঙিয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, নির্বাচন কি আদৌ সম্ভব হবে?

কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও নির্বাচন কমিশন অভাবনীয় দৃঢ়তা দেখিয়েছে। তাদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই সাফল্য বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মর্যাদাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। 

বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি) ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত ও সমালোচিত প্রতিষ্ঠান। ‘দিনের ভোট রাতে হওয়া’ কিংবা ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী’ হওয়ার মতো সংস্কৃতির কারণে কমিশন তার সাংবিধানিক মর্যাদা ও জনআস্থা হারিয়েছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবারের নির্বাচন কমিশন কেবল রুটিন মাফিক কাজ করেনি, বরং তারা নিজেদের হারানো গৌরব ও নিরপেক্ষতা পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব দেখিয়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বচ্ছ, এবং রাজনৈতিক চাপের উর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে সাহস তারা দেখিয়েছে, তা প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের ললাটে থাকা কালিমা ধুয়ে মুছে দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন এবার প্রমাণ করেছে যে, সদিচ্ছা ও মেরুদণ্ড থাকলে একটি স্বাধীন কমিশন সত্যিকার অর্থেই দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

একটি সফল নির্বাচনের জন্য দৃশ্যমান নিরাপত্তার চেয়ে অদৃশ্য নজরদারি বেশি জরুরি। নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্ব এখানে অপরিসীম। 

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এই অতি-রাজনীতিকরণ তাদের পেশাদারিত্বকে নষ্ট করে দিয়েছিল। একই সাথে পুলিশ বাহিনীকেও ব্যবহার করা হয়েছিল দলীয় লাঠিয়াল হিসেবে। সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি তখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। কিন্তু গত ১৮ মাসে এক অভাবনীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করেছে-২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা সম্পূর্ণ নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের সদস্যরা এবার কাজ করেছেন কঠোর পেশাদারিত্বের সাথে। তাদের কাজ ছিল নিখুঁত পেশাদারেত্বের এবং প্রশ্নাতীত।

এবারের নির্বাচনে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্ভুল ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ করা। তারা ব্যস্ত ছিল সম্ভাব্য নাশকতার ছক শনাক্ত করতে। ডিজিটাল নজরদারিকে ব্যবহার করা হয়েছে সাইবার অপপ্রচার ও গুজব রুখতে। কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা কণ্ঠরোধে এবার রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহৃত হবার কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এই ‘অরাজনৈতিক’ বা ‘ডিপলিটিকাইজেশন’ প্রক্রিয়াই ছিল সুন্দর নির্বাচনের মূল স্তম্ভ। পুলিশ এবং গোয়েন্দারা এবার প্রমাণ করেছেন, তারা কোনো দলের নয়, বরং রাষ্ট্রের সেবক। তাদের এই আমূল পরিবর্তন জনমনে দীর্ঘদিনের লালিত ভীতি দূর করেছে। এটিই ছিল প্রকৃত পেশাদারিত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে দেশজুড়ে যে অজানা শঙ্কা, গুজব ও অস্থিরতা বিরাজ করছিল, তা মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্যের বিকল্প ছিল না। এবারের নির্বাচনে কোনো রক্তপাত বা মারামারি না হওয়ার প্রধান কারণ হলো গোয়েন্দাদের অগ্রিম তথ্য। বিশেষ করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা বা অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর নাশকতার ছকগুলো মাঠ পর্যায়ের সেনাবাহিনী ও পুলিশ অ্যাকশনে যাওয়ার আগেই শনাক্ত করা হয়েছিল।

সেনা সদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র ও ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল কেবল নিখুঁত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই।

একটি সফল কাজের পেছনে সবসময়ই কিছু ষড়যন্ত্র থাকে। এবারের নির্বাচনেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও অপতথ্য ছড়িয়ে একদল সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মতো ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছিল। অতীতে হয়তো এ ধরনের অভিযোগের কিছু সত্যতা থাকত, কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব সেই অভিযোগকারীদের মুখেই চুনকালি মেখে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বলিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ অবস্থান এই অপপ্রচারকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার আধুনিক টেকনিক্যাল সক্ষমতাকে এবার ব্যবহার করা হয়েছে সাইবার অপপ্রচার রোধে। 

বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস মানেই দীর্ঘকাল ধরে পেশিশক্তি ও বুথ দখলের কলঙ্কিত প্রতিচ্ছবি। এই কলঙ্ক মুছে ফেলা ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্রই আমরা দেশের তরে’—এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনাপ্রধানের নির্দেশনায় বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার, অসামরিক প্রশাসন এবং গণমাধ্যমের সাথে যে চমৎকার সমন্বয় তৈরি করেছিলেন, তা-ই ছিল সফলতার চাবিকাঠি। দুর্গম সাজেক থেকে শুরু করে দক্ষিণের ঘুমধুম পর্যন্ত প্রতিটি ভোটার যখন নির্ভয়ে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন, তখনই সফল হয়েছে সেনাবাহিনীর ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ কার্যক্রম।

বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে যেখানে নির্বাচনের দিন রক্তপাত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, সেখানে ২০২৬ সালের নির্বাচন ছিল বিস্ময়করভাবে শান্তিপূর্ণ। এটি সম্ভব হয়েছে কারণ রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝতে পেরেছে যে, তাদের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি নয়, বরং সংবিধান ও জনগণের প্রতি। এই নিরপেক্ষতা কেবল নির্বাচনের দিনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং পরবর্তী ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরেও প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।

পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে রাজনৈতিক তকমা মুছে ফেলার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্যতম রক্ষাকবচ। সাংবিধানিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এভাবে তাদের পেশাদারিত্ব ধরে রাখতে পারে, তবে ভবিষ্যতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রকে জিম্মি করতে পারবে না। গণতান্ত্রিক মর্যাদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এই যাত্রায় সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আজ উত্তীর্ণ। এখন সময় এই পেশাদারিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!