× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২৫, ১২:০৫ পিএম

নারী-শিশু নির্যাতন রোধে চাই জোরালো আন্দোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২৫, ১২:০৫ পিএম

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

ছবি: রূপালী বাংলাদেশ

নারী ও শিশু নির্যাতন বর্তমান সমাজের একটি গুরুতর সমস্যা। এ ধরনের নির্যাতন শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির পথেও অন্তরায়। 

নারী ও শিশুদের ওপর অত্যাচার, শোষণ, ধর্ষণ, সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন ও অবহেলা বাড়ছে। এর ফলে নারীর নিরাপত্তা ও তাদের মৌলিক অধিকারগুলো বিপন্ন হচ্ছে। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে এবং এই সমস্যা সমাধানে সামাজিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে মানবাধিকার সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব সংস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো নারী ও শিশুদের প্রতি অত্যাচার ও নির্যাতন বন্ধ করা এবং তাদের মানবাধিকার রক্ষা করা। নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তারা যেন আইনি সহায়তা পান, এজন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলো ফ্রি লিগ্যাল অ্যাডভাইস প্রদান করে থাকে। 

তারা পুলিশ, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে সহায়তা করে এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির জন্য আইনি লড়াই চালায়। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানবাধিকার সংস্থার কাজের মধ্যে অন্যতম। 

এদের প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের আইন-প্রণেতারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করেছেন। কিছু মানবাধিকার সংস্থা নির্যাতিত নারীদের মানসিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং প্রদান করে থাকে, যাতে তারা মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। তারা আইনগত, সামাজিক ও মানসিকভাবে নারী এবং শিশুদের নিরাপত্তা ও সমর্থন প্রদানে অবিচল রয়েছে।

নারী ও শিশুদের প্রতি নির্যাতনের কুফল শুধু নির্যাতিত ব্যক্তিদের জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সমাজের সার্বিক উন্নতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এটি একটি দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন, যা জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে বিরোধী। 

এসব নির্যাতনের ফলে নারীরা সমাজে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন, আর শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। তা ছাড়া, নির্যাতনের কারণে অপরাধের হার বৃদ্ধি পায়, যা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। সমাজে যদি নারীরা বা শিশুরা নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে, তবে তা জাতির সার্বিক শান্তি ও উন্নতিতে বাধা সৃষ্টি করে। 

নারী নির্যাতন মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি গুরুতর রূপ। এটি একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা, যা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা থেকে উদ্ভূত। জাতিসংঘ নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণে অনেক আইন ও নীতি প্রণয়ন করেছে। 

এর মধ্যে রয়েছে নারীর প্রতি সব রকমের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও), যা নারীর অধিকার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। (সিডও) এটি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি যা নারীদের প্রতি বৈষম্য নির্মূলের লক্ষ্যে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

জাতিসংঘ নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রচারণা চালায়। সংস্থাটি বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা এবং প্রচারণার মাধ্যমে নারী নির্যাতন রোধে সচেতনতা সৃষ্টি করে। জাতিসংঘ নারী নির্যাতনকারীদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা ও সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করে। 

যেমন, ইউএন উইমেন নারীর প্রতি সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সহায়তা প্রদান করে এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। জাতিসংঘ নারী নির্যাতন সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা করে। এই তথ্য-উপাত্ত নারী নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে সহায়ক। আসলে মূল কথা হচ্ছে জাতিসংঘ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে নারী নির্যাতন রোধে কাজ করে চলেছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে সামাজিক আন্দোলন একটি শক্তিশালী উপায় হতে পারে। সামাজিক আন্দোলন হলো একটি জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি সমাজের সমস্যা সমাধানে কাজ করা হয়। এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং আইনগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। 

সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন বন্ধ করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়। প্রথমত, নারী ও শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞানের অভাব রয়েছে, তাই সচেতনতা তৈরির জন্য আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজের লোকজনের মধ্যে এ বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরা যায়। 

বিভিন্ন সেমিনার, সভা-সমাবেশ, গণমাধ্যমে নারী ও শিশুদের অধিকার ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে আইনগত সংস্কারের জন্য চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। রাষ্ট্র এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে মানুষের দাবি পৌঁছানোর মাধ্যমে আইনি ও বিচারিক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। 

সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়া ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য সঠিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তৃতীয়ত, সামাজিক আন্দোলন একটি বৃহত্তর সামাজিক সমর্থন তৈরি করে, যা নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য তাদের উৎসাহিত করে। একজন নির্যাতিতা নারী বা শিশু যদি সমাজের সমর্থন পায়, তবে তার পুনর্বাসন ও সুস্থ হয়ে ওঠা সহজ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী সর্বোচ্চ আইন হলো: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০। এই আইনটি নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন, এবং ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধ এবং দমন করার উদ্দেশ্যে প্রণীত। এই আইনে নারী এবং শিশুদের বিরুদ্ধে শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। 

এর মধ্যে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বাল্যবিবাহ, গার্হস্থ্য সহিংসতা, শিশু পাচার ইত্যাদি অপরাধ অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া, মুসলিম পারিবারিক আইন দণ্ডবিধি ১৮৬০ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনও নারী ও শিশুদের প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিধান সংবলিত। 

তবে, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা এবং বিচারপ্রাপ্তির জন্য এই আইনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার জন্য অপরাধীদের কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের জন্য দীর্ঘকালীন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের শাস্তি রয়েছে। 

ধর্ষণের সংজ্ঞা ও শাস্তির নিয়ম স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়নের জন্য বিশেষ শাস্তির বিধান রয়েছে এই আইনে। বাল্যবিবাহ এবং শিশু পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন তৈরি করা হয়েছে। এই ধরনের অপরাধের জন্য অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা হয়। 

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ যথাযথভাবে গ্রহণ এবং দ্রুত তদন্ত করার জন্য পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নারীদের ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা কমানোর এবং তাদের অধিকার রক্ষার জন্য একটি আইনগত কাঠামো স্থাপন করা হয়েছে দারুণভাবে। 

মুসলিম পারিবারিক আইন ও দণ্ডবিধি ১৮৬০, বিশেষত নারীদের এবং শিশুদের বিরুদ্ধে নির্যাতন বা অত্যাচার সম্পর্কিত কিছু বিধান প্রদান করে। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর কিছু ধারা নারী ও শিশু নির্যাতনের জন্য দণ্ডনীয় অপরাধের পরিভাষা এবং তার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করেছে। 

মুসলিম পারিবারিক আইন, বিশেষত ব্যক্তিগত বিষয় যেমন-বিবাহ, তালাক, যৌতুক, মাতৃত্ব, দত্তক গ্রহণ, প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণ করে, তবে নারীদের প্রতি নির্যাতন বা শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণের ব্যাপারে দণ্ডবিধি কিছু মৌলিক বিধান প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে, ধারা ৩৫৭-এ বলা হয়েছে, যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ হতে পারে, এবং তা নারী বা শিশুর প্রতি অত্যাচারের অঙ্গ হিসেবে গণ্য হতে পারে। 

এ ছাড়া ধারা ৩৫৮ অনুযায়ী, শিশু বা নারীকে শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া, ধারা ৩৭৭-এ বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি যৌন নির্যাতন বা শিশুর প্রতি অশ্লীল আচরণ করে, তাকে গুরুতর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। 

মুসলিম পারিবারিক আইনে প্রমাণিত নির্যাতনের ক্ষেত্রে নারীর অধিকার এবং ভরণপোষণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়, এবং যদি কেউ নারী বা শিশুকে শারীরিক অথবা মানসিকভাবে নির্যাতন করে, তবে দণ্ডবিধি অনুসারে তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা আছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে সামাজিক আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি সচেতন হয় এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, তবে এটি দ্রুত রোধ করা সম্ভব। আমাদের উচিত, পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় পর্যায়ে নারী ও শিশুদের প্রতি সহানুভূতি, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া। 

সামাজিক আন্দোলন, প্রচারণা এবং আইনি সংস্কারের মাধ্যমে আমরা নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারি, যাতে সমাজে নারী ও শিশুদের প্রতি শোষণ এবং নির্যাতন কমিয়ে আনা যায়। 

লেখক: প্রকৌশলী, কলাম লেখক

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!