ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

তাৎপর্য, গুরুত্ব ও শরিয়তের বিধানে ফিতরা কি ?

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম
শরিয়তের বিধানে ফিতরা কি ? ছবি : সংগৃহীত

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার কঠোর সংযম শেষে ঈদুল ফিতরের দিন যখন রোজা ভঙ্গ করা হয়, তখন সেই আনন্দ ও শুকরিয়া উপলক্ষে শরিয়ত নির্ধারিত যে দান অসহায় ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়, তাকেই সদকাতুল ফিতর নামে আখ্যায়িত করা হয়। এটি কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বরং এটি রোজাদারের এক মাসের ইবাদতকে পূর্ণতা দেওয়ার একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া।

১. ফিতরা কী?
‘ফিতর’ মানে রোজা ভাঙা বা ইফতার করা। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গরিবদের যে নির্দিষ্ট পরিমাণ দান করা হয়, তাকেই সদকাতুল ফিতর বলা হয়। এটি মূলত রমজানের রোজার ভুলত্রুটি সংশোধন এবং আনন্দের একটি অংশ।

২. ফিতরা কেন দিতে হয়? (উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য)
ইসলামে ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার পেছনে দুটি মূল উদ্দেশ্য রয়েছে:

রোজার ত্রুটি বিচ্যুতি মোচন: রোজা থাকা অবস্থায় মানুষের অজান্তেই ছোটখাটো অনেক ভুল বা অনর্থক কথাবার্তা হয়ে যেতে পারে। ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সেই রোজাগুলোকে ত্রুটিমুক্ত ও পবিত্র করেন।

গরিবের ঈদ উদযাপন: ঈদের দিনে যাতে সমাজের কোনো অভাবী মানুষ ক্ষুধার্ত না থাকে এবং সবাই মিলে আনন্দ করতে পারে, সেই সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করাই ফিতরার লক্ষ্য। (হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন রোজাদারের অনর্থক কথা ও কাজ থেকে পবিত্র করার জন্য এবং অভাবগ্রস্তদের খাবারের ব্যবস্থার জন্য। (আবু দাউদ)

৩. কাদের ওপর ফিতরা ওয়াজিব?
ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে। এটি কেবল ধনীদের জন্য নয়, বরং মধ্যবিত্ত অনেকের ওপরও ওয়াজিব হয়:

নিসাব পরিমাণ সম্পদ: ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় যদি কারো কাছে ঋণ ও মৌলিক প্রয়োজন (বসবাসের ঘর, পোশাক, আসবাবপত্র ইত্যাদি) বাদে সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে ৭ তোলা সোনা অথবা তার সমমূল্যের নগদ টাকা বা পণ্য থাকে, তবে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব।

মালিকানাধীন সবার পক্ষ থেকে: পরিবারের কর্তা তার নিজের এবং তার ওপর নির্ভরশীল ছোট সন্তানদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করবেন। এমনকি ঈদের দিন সুবহে সাদিকের আগে যদি কোনো সন্তান জন্ম নেয়, তবে তার পক্ষ থেকেও ফিতরা দিতে হবে।

স্বাধীন ও মুসলিম: ফিতরা কেবল মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব এবং এটি স্বাধীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

৪. কাদের ফিতরা দেওয়া যাবে?
যাদের যাকাত দেওয়া যায়, তাদেরই ফিতরা দেওয়া যায়। অর্থাৎ: অসহায়, গরিব এবং মিসকিনদের। নিজের আপন মা-বাবা, দাদা-দাদি বা ছেলে-মেয়েকে ফিতরা দেওয়া যায় না। তবে ভাই-বোন বা অন্যান্য আত্মীয় যদি গরিব হয়, তবে তাদের দিলে দ্বিগুণ সওয়াব (ফিতরা ও আত্মীয়তার হক) পাওয়া যায়।

৫. কখন আদায় করতে হয়?
ফিতরা আদায়ের সর্বোত্তম সময় হলো ঈদের নামাজের আগে। তবে রমজান মাস চলাকালীন যেকোনো সময় এটি আদায় করা জায়েজ। নামাজের পর আদায় করলে তা সাধারণ সদকা হিসেবে গণ্য হবে, ফিতরার বিশেষ সওয়াব পাওয়া যাবে না।

সদকাতুল ফিতর কেবল একটি প্রথা নয়, বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিকতার বহিঃপ্রকাশ। সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিমের উচিত সঠিক সময়ে ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে নিজের রোজাগুলো পবিত্র করা এবং অভাবীদের মুখে হাসি ফোটানো।