সুরা নূরের ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী, তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে তারা আত্মীয়স্বজন, অভাবগ্রস্ত ও আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের কিছুই দেবে না। তারা যেন ক্ষমা করে এবং দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? আর আল্লাহ তো পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।’
এই আয়াতটি আমাদের জন্য বহুমুখী শিক্ষা বহন করে। এর পেছনে রয়েছে এক হৃদয়স্পর্শী ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যা মানবিকতা, ক্ষমা ও নিঃস্বার্থ দানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
হজরত আবু বকর (রা.)-এর এক নিকটাত্মীয়ের নাম ছিল মিসতাহ (রা.)। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ–এর সাহাবি, একজন মুহাজির এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহসী যোদ্ধাদের অন্যতম। আর্থিকভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অসচ্ছল ও সহায়-সম্বলহীন। এই অবস্থায় হজরত আবু বকর (রা.) সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে তার জন্য নিয়মিত মাসিক ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন।
বনু মুসতালিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে এক দুঃখজনক ঘটনার সূত্র ধরে হজরত আয়েশা (রা.)-কে নিয়ে এক জঘন্য অপবাদ ছড়িয়ে পড়ে। এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে ছিল মুনাফিকদের একটি দল। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মানুষের মধ্যে কটূকথা ছড়াতে থাকে। বিষয়টি যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ ও হজরত আবু বকর (রা.)-এর কানে পৌঁছে, তখন তারা গভীরভাবে মর্মাহত হন।
পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা ওহির মাধ্যমে এই অপবাদ সম্পূর্ণভাবে খণ্ডন করেন এবং ষড়যন্ত্রকারীদের পরিচয়ও প্রকাশ করে দেন। দুর্ভাগ্যবশত, এই অপবাদ ছড়ানোর ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে মিসতাহ (রা.)-ও ছিলেন।
এ কথা জানার পর হজরত আবু বকর (রা.) প্রচণ্ডভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ হন। তিনি শপথ করে ঘোষণা দেন যে, মিসতাহ (রা.)-এর জন্য নির্ধারিত ভাতা তিনি বন্ধ করে দেবেন এবং ভবিষ্যতে আর কোনো সহায়তাও করবেন না।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই মহান আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন। আয়াতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়—যারা সামর্থ্যবান, তারা যেন নিকটাত্মীয়, দরিদ্র ও আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীদের সহায়তা বন্ধ করার শপথ না করে। অর্থাৎ গ্রহীতা কোনো কষ্টদায়ক বা অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ করলেও দাতা যেন তার দান বন্ধ না করে।
এই ঘটনা আমাদের শেখায়- দান কোনো ব্যক্তির জন্য নয়; দান কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। গ্রহীতার আচরণ, কৃতজ্ঞতা কিংবা অকৃতজ্ঞতা দানের মানদণ্ড হতে পারে না।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তায়ালা যখন প্রশ্ন করেন, ‘তোমরা কি চাও না আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’ এই প্রশ্ন হজরত আবু বকর (রা.)-এর হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মিসতাহ (রা.)-কে ক্ষমা করে দেন এবং পূর্বের মতো ভাতা পুনরায় চালু করে দেন।
এভাবেই হজরত আবু বকর (রা.) আমাদের জন্য স্থাপন করে গেছেন ক্ষমা, মহানুভবতা ও নিঃস্বার্থ দানের এক চিরন্তন আদর্শ।

