ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও পারিবারিক বন্ধনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইসলামের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘সিলাতুর রাহিম’ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা। তবে বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই সামান্য স্বার্থের সংঘাতে মানুষ নিজের আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছে। ইসলামের আলোকে এটি কেবল একটি সামাজিক অপরাধই নয়, বরং পরকালীন জীবনে ভয়াবহ পরিণতির কারণ।
ইসলামি জীবনদর্শনে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা একটি আবশ্যিক ইবাদত। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করা হয়েছে।
আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা মহান আল্লাহর নির্দেশ। যারা এই নির্দেশ অমান্য করে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করে, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সতর্ক করে বলেছেন: “তবে কি তোমরা এই আশা করছ যে, যদি তোমরা শাসনক্ষমতা পাও, তবে তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরাই তারা, যাদের আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন এবং তাদের বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করে দিয়েছেন।” (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২২-২৩)
হাদিসের কঠিন হুঁশিয়ারি
রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীকে জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে একাধিক সহিহ হাদিস রয়েছে:
১. জান্নাতে প্রবেশে বাধা: হযরত জুবায়ের ইবনে মুতয়িম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না ” (সহিহ বুখারি)
২. দোয়া কবুল না হওয়া: হাদিসে এসেছে, যে সমাজে বা যে মজলিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি থাকে, সেখানে আল্লাহর রহমত নাজিল হয় না। এমনকি তাদের আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার পথেও তা প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।
৩. দুনিয়ায় শাস্তি: রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, “অনাচার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো অন্য কোনো পাপ নেই, যার হোতাকে দুনিয়াতেও আল্লাহ শাস্তি দেন এবং আখেরাতের জন্যও তা জমা রাখেন।” (তিরমিজি)
ইসলামে আত্মীয়তার সংজ্ঞা ও পরিধি
সাধারণত রক্তসম্পর্কীয় এবং বৈবাহিক সূত্রে সম্পর্কিত ব্যক্তিরাই আত্মীয়ের অন্তর্ভুক্ত। তবে ইসলাম কেবল তাদের সাথেই ভালো ব্যবহারের কথা বলেনি যারা আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে। বরং প্রকৃত বীর সেই ব্যক্তি, যে আত্মীয় সম্পর্ক ছিন্ন করলে তা পুনরায় জুড়ে দেয়।
সম্পর্ক ছিন্ন করার নেতিবাচক প্রভাব
পারিবারিক অশান্তি: আত্মীয়দের সাথে দূরত্ব সমাজে বিশৃঙ্খলা ও হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়।
রহমত ও বরকত হ্রাস: সম্পর্ক ছিন্নকারীর রিজিকে বরকত কমে যায় এবং হায়াত বা দীর্ঘায়ু লাভের সুযোগ সংকুচিত হয়।
সামাজিক অবক্ষয়: আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়লে সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।
প্রতিকার ও মুমিনের করণীয়
ইসলামি আলেমদের মতে, কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা ঝগড়া হলে তা দ্রুত মিটিয়ে ফেলা উচিত। ক্ষমা করা এবং সবর করা মুমিনের অন্যতম গুণ। অন্যের ভুলকে বড় করে না দেখে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই ইসলামের শিক্ষা।
পবিত্র জান্নাত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা অপরিহার্য। আসুন, আমরা ইসলামের এই মহান শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করি এবং নিজের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি।


