এমবাপ্পের একমাত্র গোলে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে ফ্রান্স। রোববার (৫ জুলাই) বাংলাদেশ সময় ভোররাতে যুক্তরাষ্ট্রের লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ড স্টেডিয়ামে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে পরাজিত করে ফরাসিরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া ম্যাচটিতে ৭০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে চলমান আসরে নিজের সপ্তম গোল করে ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলেন এমবাপে। আর বিদায় নেয় প্যারাগুয়ে।
ম্যাচের প্রথম মিনিটেই আক্রমণে যায় ফ্রান্স। মুহূর্তেই পাল্টা আক্রমণে ওঠে ফ্রান্স। জুল কুন্দে বল নিয়ে প্রতিপক্ষের অর্ধে উঠে ডান পাশে উসমান দেম্বেলের কাছে পাস দেন। দেম্বেলে বক্সের ভেতরে নিচু ক্রস বাড়ালে সেখানে পৌঁছে যান কিলিয়ান এমবাপে। তবে শট নেওয়ার আগেই প্যারাগুয়ের ডিফেন্ডাররা বল ক্লিয়ার করে বিপদ সামলে নেয়।
১১ মিনিটে ডান প্রান্ত দিয়ে একক প্রচেষ্টায় এগোনোর চেষ্টা করেন এনসিসো। তবে মুহূর্তের মধ্যেই তাকে ঘিরে ফেলেন ফ্রান্সের একাধিক ডিফেন্ডার। শেষ পর্যন্ত উইলিয়াম সালিবা নিখুঁত ট্যাকলে বল কেড়ে নিয়ে ফ্রান্সের দখল ফিরিয়ে আনেন।
বল দখল পেলেও তা ধরে রাখতে পারছিলো না প্যারাগুয়ে। নিজেদের অর্ধ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার চেষ্টায় বারবার সমস্যায় পড়ছে তারা। সামনের দিকে বাড়ানো বেশিরভাগ পাসই সহজে সামলে নিচ্ছে ফ্রান্সের রক্ষণভাগ
৩১ মিনিটে দারুণ একটি আক্রমণ গড়ে তোলে ফ্রান্স। ডান প্রান্তে বল পেয়ে বক্সে চমৎকার ক্রস তোলেন উসমান দেম্বেলে। সেখানে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপে, কিন্তু ঠিক সময়ে লাফ দিতে না পারায় বলে স্পর্শ করতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত বল মাঠের বাইরে চলে যায়।
৩৩ মিনিটে চমৎকার বুদ্ধিদীপ্ত ছেড়ে দেওয়া পাস দেন ওলিসে। বলটি পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে শট নেন আদ্রিয়েন রাবিও। তবে তার প্রচেষ্টা লক্ষ্যে ছিল না; বল সোজা গোলের পেছনের গ্যালারিতে গিয়ে পড়ে।
ম্যাচের ৩৬তম মিনিটে প্যারাগুয়ের বক্সের ঠিক বাইরে ফাউলের শিকার হন কিলিয়ান এমবাপে। সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট ফরাসি অধিনায়ক সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া দেখান। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তিনি আন্দ্রেস কুবাসকে হালকাভাবে ধাক্কা দেন।
এতে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে মুহূর্তেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান। তবে রেফারি দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে বিরোধ মিটিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত কোনো খেলোয়াড়কেই কার্ড দেখানো হয়নি।
প্রথমার্ধের খেলা শেষে দুই দলের কেউই পায়নি গোলের দেখা। প্রথমার্ধের খেলা শেষে ৮০ শতাংশ বল দখলে রেখে ৬ বার শট নিয়ে লক্ষ্যে রেখেছে ফ্রান্স মাত্র একটি। তবে দুটি শট নিয়ে একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি ২০ শতাংশ বল দখলে রাখা প্যারাগুয়ে।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা মাঠে ফিরলে ৪৭ মিনিটে মাঝমাঠে ফ্রি-কিক পায় প্যারাগুয়ে। আলমিরন ফাউলের শিকার হলে সুযোগটি আসে। তবে সেট-পিস থেকে কোনো কার্যকর আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি দক্ষিণ আমেরিকার দলটি।
৪৯ মিনিটে আক্রমণে ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপ্পের পাসে বক্সের ভেতরে বল পান জুল কুন্দে। তবে ওই জায়গায় একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় থাকলে হয়তো সুযোগটি আরও বিপজ্জনক হতে পারত। বার্সেলোনা ডিফেন্ডার বল নিয়ন্ত্রণে রাখলেও শেষ পর্যন্ত কার্যকর কিছু করতে পারেননি, বল হারিয়ে নষ্ট হয় সম্ভাবনাময় আক্রমণটি।
৫১ মিনিটে খুবই দারুণ সুযোগ মিস করেন এমবাপে। দ্রুত পাল্টা আক্রমণের সুযোগ পেয়েছিল ফ্রান্স। বাম দিক থেকে আলোনসোর থ্রো-ইন সহজেই তালুবন্দি করেন গোলরক্ষক মেইনিয়ান। এরপর মুহূর্তেই লম্বা কিকে সামনে থাকা কিলিয়ান এমবাপেকে খুঁজে নেন তিনি। এমবাপ্পে গোলের দিকে ছুটলেও বলটি ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি। সেই সুযোগে দ্রুত পেছন থেকে ফিরে এসে কাসেরেস বল ক্লিয়ার করে কর্নারের বিনিময়ে বিপদমুক্ত করেন প্যারাগুয়েকে।
৬৪ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ভাগ্য পরীক্ষা করেন কিলিয়ান এমবাপে। তবে তার শট অনেক ওপর দিয়ে গ্যালারিতে গিয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত ম্যাচে ফ্রান্সের আক্রমণের চিত্রটা যেন এই শটেই ফুটে উঠলো। সুযোগ তৈরি করলেও শেষ মুহূর্তে ধার দেখাতে পারছে না তারা।
৭০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে নেন কিলিয়ান এমবাপে। ভিএআরে দেখা হচ্ছে, বক্সের ভেতরে দুয়ে ফাউলের শিকার হয়েছিলেন কি না। পেনাল্টির সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত যাচাই করে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত জানান ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি।
পেনাল্টি নিতে এসে ফ্রান্স অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে গিয়ে রান-আপে গতি কমিয়ে গোলরক্ষককে ভুল পথে পাঠান। এরপর নিখুঁত শটে বল জড়িয়ে দেন জালের ডান নিচের কোণে। এটি চলতি বিশ্বকাপে এমবাপের সপ্তম গোল এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে ১৯তম গোল। এই তালিকায় তার চেয়ে এগিয়ে আছেন শুধু লিওনেল মেসি।
গোল হজমের পর একাধিক পরিবর্তন আনে প্যারাগুয়ে। মাঠ ছাড়েন মিগেল আলমিরন ও গুস্তাভো গোমেজ। তাদের পরিবর্তে নামেন গ্যাব্রিয়েল আভালোস এবং মরিসিও।
৭৩ মিনিটে হাইড্রেশন ব্রেক শুরু হলে দুই দলের খেলোয়াড়দের মাঝে আবারও কথার লড়াই শুরু হয়। ফ্রান্সের হয়ে সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে।
গোল হজমের পর সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালানো শুরু করে প্যারাগুয়ে। বক্সের ঠিক বাইরে ৮৬ মিনিটে বল পেয়ে শট নেন আলোনসো। তবে তার প্রচেষ্টা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বল ডান পোস্টের অনেক বাইরে দিয়ে চলে যায়।
৮৮ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে ওঠে ফ্রান্স। বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকেই শট নেন কিলিয়ান এমবাপে। তবে সতর্ক ছিলেন গোলরক্ষক গিল। দারুণ দক্ষতায় দুই হাতে বল ঠেকিয়ে বিপদমুক্ত করেন তিনি।
৯০ মিনিটের খেলা শেষে অতিরিক্ত ১০ মিনিটের খেলার নির্দেশনা দেয় রেফারি। সেই অতিরিক্ত সময়ের অষ্টম মিনিটে অসাধারণ এক আক্রমণ গড়ে তোলে ফ্রান্স। দুর্দান্ত থ্রু পাসে বাম প্রান্তে দুএকে খুঁজে নেন ওলিসে। দুয়ে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে এমবাপের দিকে পাস বাড়ান। বক্সের কিনারা থেকে এমবাপের প্রথম শটটি দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক গিল। ফিরে আসা বল আবারও পেয়ে বাঁ পায়ের শটে গোলের উদ্দেশে পাঠান এমবাপে। কিন্তু এবারও অসাধারণ প্রতিক্রিয়ায় গিল বল ঠেকিয়ে ফ্রান্সকে দ্বিতীয় গোল থেকে বঞ্চিত করেন।
শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলের জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায় আসরের অন্যতম ফেবারিট ফ্রান্স।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন